Thursday, December 31, 2015

শব্দকোষ

রোজ সকালে বাড়ির উঠোনে একটা নিচু পিঁড়িতে বসে বড় জেঠিমা কুলোয় করে চাল ঝাড়ত। চালের একটা পড়ত কুলো থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে উঠে আবার নেমে আসত ঝিপ ঝিপ শব্দের তালে তালে। চাল থেকে বেছে রাখা খুদকুঁড়ো জমা করে রাখা হত একটা পুরনো দালদার টিনে। জেঠু মুঠো ভরে সেগুলো ছন ছন করে রকে ছড়িয়ে দিতেই ঝটাপট হুম হুম বক বক বকম বকম শব্দ তুলে গোলা লোটন গেরোবাজের দল রান্নাঘরের টালির চাল থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে কংক্রিটে টুক টুক করে ঠোঁট ঠুকে ঠুকে নিমেষে সাবড়ে দিত সব। মার্ফি রেডিওটা খড়বড় খড়বড় করে উঠে বলত 'বিবর্তনের পথে মানুষ'...। বাগানে দুটো ইঁটের ফাঁকে শুকনো ডালপাতা সাজিয়ে ফস করে দেশলাই জ্বেলে ঠাকুমা এক হাঁড়ি চানের জল চাপিয়ে বসে থাকত একটু দূরে। চটপটমড়মড় করে জ্বলে ওঠার খানিক পরেই এলুমিনিয়াম হাঁড়ির জল টগবগটগটব করে ফুটে উঠে উথলে গিয়ে ফ্যাঁসসস করে আগুন নিভিয়ে দিত। ছোটকাকা অ্যাল্লল্লল্লল্লল্ল গ্লল্লল্লল্ল গ্লাগগ্লাগগ্লাগ পুচুক করে সাড়া বাড়ি জানিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলত উঠোনের কলে। দাদুর খুরপি খুপ খুপ করে গাছের তলার মাটি আলগা করত। ঠুং করে জানান দিত মাটিতে মিশে থাকা ইঁটের টুকরোর খবর। উপুড় করে রাখা স্টীলের গ্লাসটা তুলে কুঁজোর গলার কাছটা ধরে নামিয়ে আনতেই বগবগবগবগ শব্দে জল বেরিয়ে এসে ভরিয়ে দিত গ্লাসের ফাঁদ। পাথরে নরুন ঘষার শব্দ ছিল। ছোট পেতলের হামানদিস্তায় পান ছাঁচার শব্দ ছিল। জাঁতিতে সুপুরি কাটার শব্দও...
যেসব শব্দেরা ছোটবেলা ঘিরে ছিল তাদের অনেকগুলোই আজ আর নেই।

নতুন শব্দেরা এক এক করে জীবনে জায়গা করে নিয়েছে। শিলনোড়ার শব্দের বদলে মিক্সির শব্দ, খাতায় পেন ঘষার শব্দের বদলে কীবোর্ড টেপার শব্দ। গ্র্যান্ডফাদারের ঢং ঢং থেকে অজন্তা ঘড়ির টুংটাং। ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং থেকে পলিফোনিক থেকে এমপিথ্রি। এই ঘুর্ণায়মান শব্দটানেলের ভেতর দিয়ে যতই এগিয়ে চলেছি পেছনে একের পর এক দরজার নিঃশব্দ বন্ধ হওয়া টের পেতে পেতে, মস্তিষ্কের ক্রমবর্ধমান ভার স্মৃতির পায়রাখোপে ঠুসে দিতে থাকে দৈনন্দিনতার সাদামাটা মূর্ছনা।

রাতের হুল্লোড়ঘোর কাটিয়ে নতুন বছরের সকালে চোখ খোলার আগেই পাশের বাড়ির ঝপাস জল ঢেলে খ্যাংরা কাঠির ঝাঁটার খর খর ছপাস খর খর ছপাস শুনলেই বুঝব, মাংসের ভেতরে লাব ডুব লাব ডুব ছন্দে বয়ে চলা রক্ত, ক্যালেন্ডারকে থোড়াই কেয়ার করে।

Monday, December 21, 2015

কৃষ্ণকলি? হাউ সিলি...

সেই কোন ছোটবেলায় কাকিমার তুতো ভাইয়ের ফর্সা ছেলে আমাকে দায়িত্ব নিয়ে বলেছিল 'তুই এত কালো কেন? রোজ সাবান মাখিস না? আমাকে দ্যাখ আমি রোজ সাবান মাখি তাই এত ফর্সা।' সেইদিন থেকে বলছি ফাদার মাদার গড প্রমিস, আমি রোজ গরমকালে দুবেলা আর শীতে একবেলা করে নিয়ম করে সাবান মেখে আসছি যদি রঙটা এখটু খোলতাই হয় সেই আশায়। তবে এই গরীবের আশায় সমস্ত সাবান কোম্পানিই এক এক করে ছাই দিয়েছে। সেই দুঃখে কখনো আমার ফর্সা টুকটুকে কাকিমার মেয়ে হয়ে যাব ভেবেছি, আপেল খেলে রাজীব গান্ধীর মতো গোলাপি গাল হবে, মায়ের এই গুল বেবাক হজম করে যখনই আপেল দিয়েছে তখনই খেয়ে নিয়েছি। কাঁচা হলুদ বাটা আর সর মেখে সঙ সেজে বসে থেকেছি ফি রোববার। খোদাতালার দেওয়া রঙ এমনই পাকা, যে কোনকিছুতেই বিন্দুমাত্র টসকায়নি।

তারপর একদিন ক্লাস ফাইভ নাগাদ একসঙ্গে অনেক কিছু জানতে পারলাম। কন্ট্যাক্ট লেন্স কাকে বলে জানলাম, তা দিয়ে যে চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেলা যায় জানলাম, আর স্রেফ চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেললেই উত্তম ছদ্মবেশ ধরা যায় তাও। সেইসঙ্গে জানলাম নায়িকার রঙও আমার গায়ের মতোই কালো হতে পারে (নায়িকা হবার দুঃসাধ্য সাধ অবশ্য তাতেও জাগেনি থ্যাঙ্কফুলি) আর এও জানলাম যে কটা চোখের কালো নায়িকাকে নিয়ে গান লেখা যেতে পারে ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল...

তারপর একে একে অনেক কিছু জানতে লাগলাম। নাওমি ক্যাম্পবেল চিনলাম, নয়নিকা চ্যাটার্জি চিনলাম, ছায়াসূর্য দেখলাম, কৃষ্ণকলি শুনলাম, আর প্রেমে পড়্রতে, চুমু খেতে, টিউবলাইটের ফ্যাটফ্যাটে আলোর নীচেও উদ্দাম হতে যে গায়ের রঙের বিশেষ ভূমিকা থাকে না, ক্রমে ক্রমে জেনে গেলাম এর সবটুকুই। তারপরে শুনলাম কবে নাকি কোন কবি কাকে বলেছিলেন তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা ইত্যাদি প্রভৃতি। সব মিলিয়ে কনফিডেন্সে হেব্বি তোল্লাই।

তারপর কৃষ্ণকলির বয়স বেড়েছে ঢের। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফ্যাশনজ্ঞান। কৃষ্ণকলির নায়ক ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসামের ব্র্যান্ড আম্বাস্যাডার হয়েছে।

আর কৃষ্ণকলি? ওমা! সে কই! সে তো আর নাই!!! তার গলা মুখ মেমসাহেবের মতো সাদা, গালে রাজীব গান্ধীর মতো গোলাপি আভা, ঠোঁট টকটকে লাল, আর তার আঁচল উড়ে উড়ে আকাশবাতাস ছেয়ে বিশ্বসংসারের সমস্ত কালো মেয়ের কনফিডেন্স নিয়ে গেন্ডুয়া খেলছে।

গেন্ডুয়া গেন্ডুয়া...উচ্চারণভেদে গেরুয়া গেরুয়া।

Monday, December 14, 2015

ঘোর কলি

তারপর সেদিন তো খিদেয় যাকে বলে পেট দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। তাও আবার যেমন তেমন খিদে নয়। বাংলা মাংস-ভাতের খিদে। খুব স্পেসিফিক চাহিদা। এদিকে ঘড়িতে দুপুর বেজেছে; হাতের কাজটুকুও শেষ; ডিসেম্বরের টলটলে দুপুর আস্তে ধীরে গড়িয়ে নামছে। নিউ মার্কেটের দিক থেকে গ্লবের গলিতে ঢুকে বাঁয়ে ঘুরে, ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে পড়ে, রাস্তা টপকে, ফায়ার ব্রিগেড ক্রস করে, পরের মোড়ে বাঁ দিকে ঘুরতেই কস্তূরী। না না আসলে হিংলাজ। যোজন ক্রোশ মরুভূমি পেরিয়ে আসা তীর্থযাত্রির মতোই হুড়মুড়িয়ে দৌড় দিলাম দোতলার দিকে। বাইরের বেসিনে হাত ধুয়ে কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতেই একরাশ আমিষ গন্ধ এসে ডাইভ মারল নাকের ফুটো লক্ষ্য করে। একগাদা লোক তখন টেবিলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হাসিমুখের বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল - "কজন?"
ডান তর্জনীখানা তুলে বুঝিয়ে দিলাম যে ন্যাকা হলেও আসলে আমি একা। ব্যস!
বেচারার বাদামের খোসারং মুখের মধ্যে সাদা চোখ দুটো গোল হয়ে উঠে ভুরু অবধি পৌঁছে আবার প্রশ্ন 'একা!?' আবার মাথাখানা সামনে পেছনে নাড়িয়ে জানালাম হ্যাঁ। অবশেষে সে ঘুরে গিয়ে একটা টেবিল দেখিয়ে দিল। বুঝলাম, বেচারা জানেই না, মহিলারাও নিজে নিজে স্রেফ একা একা খেতে পারে কারুর সাহায্য না নিয়েই। বড় মায়া হলো। ঠিক করলাম বেচারাকে নিরাশ করব না।
ছোট স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাটির একবাটি ঝাল ঝাল শুকনো শুকনো চিকেন ভরতা আর নৌকোর মতো স্টীলের বাটির একবাটি ঝোল ঝোল খাসির মাংস উইথ দামড়া আলু মেখে একথালা ফুলকো ফুলকো ভাত হুশ করে উড়িয়ে দিলাম। শেষের অংশটায় একটু গন্ধ লেবুর রস মেখে নিয়েছিলাম। তারপর চাটনি। কিন্তু আমের চাটনি না থাকায় সে প্ল্যান ক্যানসেল করে দিয়ে প্লেটে জরুরি অবতরণ ঘটিয়ে বসল একবাটি রসমালাই। মরে যাওয়া দুধের লালচে ক্ষীরের মধ্যে নরম তুলতুলে প্রায় ভালনারেবল দুখানা রসগোল্লা, যার এক টুকরো চামচে কেটে একটু ক্ষীর সমেত মুখে তুললেই ওই গোবর্ধন বেয়ারাকে পজ্জন্ত ক্ষমা করে ফেলা যায়।
সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যতটা সম্ভব গন্ধ হাত থেকে দূর করার চেষ্টা করে বিফল হয়ে কাউন্টারে ফিরে এসে মিছরি দেওয়া মৌরি চিবুতে চিবুতে দুখানা টুথপিক পকেটস্থ করে, সেই আশ্চয্য কাজটা করে ফেললাম। ব্যাগ থেকে পারস বের করে পয়সা দিয়ে ফেললাম।

কী আশ্চয্যের ব্যপার বলুন তো! মেয়েমানুষ, নিজে হাতে করে একা একা ভালোমন্দ গিলে পকেট থেকে পয়সা বের করে দাম চুকিয়ে বেরিয়ে গেল! কোনও লোকাল গার্জেনের তত্ত্বাবধান ছাড়াই! এও হয়! ঘোর কলি...

Thursday, November 26, 2015

স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী

রবীন্দ্রনাথ, লেনিন, বাবা-মা আর নারীর যৌনাঙ্গ নেই। মানে আছে, কিন্তু থাকতে নেই। মানে থাকতে আছে, কিন্তু তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা চলে না। এঁদের যৌনজীবন, পছন্দ অপছন্দ, অভ্যেস, চয়েস কোনকিছু নিয়েই না। এর মধ্য়ে আবার মহিলাদের ব্যপারটা আরেক ধাপ এগিয়ে। কোনভাবে যদি এমন খবর পাওয়া যায় যে অমুক মহিলা তমুক লোকটার সঙ্গে থাকবে বলে নিজের বর-কে ছেড়ে চলে এসেছে, সংস্কারী জনতা তার শাপশাপান্ত বাপবাপান্ত করে সোশ্যাল মিডিয়া নামক চন্ডিমন্ডপে একে অপরের গা টিপে, চোখ মেরে রসালো জোক ছড়িয়ে দিয়ে বলবে - উফফ কী জিনিস! ওর খিদে মেটানো কি আর অমুকের কম্ম রে?

তার ওপর যদি দেখা যায় সেই মহিলা দু পয়সা কামিয়েছে এবং তালেবর হনুদের কম্যান্ড করে বেড়াচ্ছে জ্বলুনি আরও বেড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় শোনা যেতে থাকে - আরে এইসব মহিলাদের চিনতে কারুর বাকি নেই। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যার তার বিছানা গরম করতে এদের বিবেকে বাধে না।

বিবেক মানুষটা আবার খুব ফ্লেক্সিবল। কখনো বাবল গামের মতোন ফুলে ওঠে আবার কখনো লাথ খাওয়া কেন্নোর মতো কুঁকড়ে গর্তে সেঁধোয়। সুনন্দা পুষ্কর রহস্যজনকভাবে মারা যাবার পর বিবেক বোধকরি জুড়িগাড়ি চেপে হাওয়া খেতে বেরোয়। যে বিবেক 'দেখেছ কান্ড! নষ্ট মেয়েছেলেটা শশি থারুরের মতো সুপাত্রকে পাকড়েছে? নাহয় কটা বিয়েই করেছে। তাতে কী? হীরের আংটি আবার বেঁকা! তাছাড়া পুরুষমানুষের অমন একটু আধটু দোষ থাকেই। আহা কী সুন্দর ইংরিজি বলে, কেমন ফর্সা রং...আহা! ওই মেয়ছেলের আছে টা কী?' বলে হাঁক পেড়েছিল, সে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়।

ইন্দ্রাণী মুখুজ্জ্যের বিছানার রোল কল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দেশভক্ত জনতা ভুলে যায়, সংবিধান বলেছে, বিচারাধীন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ -  innocent until proven guilty। আসলে অপরাধ নিয়ে তো তাদের মাথাব্যথা নেই। অপরাধী শনাক্ত হওয়া কিম্বা শাস্তি পাওয়ার ব্যপারটাও গৌণ। প্রাণভরে স্লাট শেমিং করা গেলে আর কী চাই? তাই, ইন্দ্রাণীর স্বামী গ্রেফতার হবার পর তারা বলেই ফেলে 'বাবা কী মেয়ে দেখেছ! সকলকে নাচিয়ে ছেড়েছে।'

এ কথা মানুষমাত্রেই জানে, যে স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী। স্ত্রী'র কথা শুনে চলে যে পুরুষ তাকে বলা হয় স্ত্রৈণ। স্বামীর কথা শুনে চলা/অনুগত স্ত্রী-এর জন্য অবশ্য এমন কোনও শব্দ অভিধানে নেই। কারণ স্পষ্ট। স্ত্রী স্বামীর কথা শুনবে এতে আবার অস্বাভাবিক কী আছে? এমনটাই তো হওয়ার কথা! তাও যদি চুপিচুপি ঘরের দোর দিয়ে বৌ-এর কথা শোনো মেনে নেওয়া যায়। প্রকাশ্যে স্ত্রী-এর উল্লেখমাত্র করলেও বাজারে জল্পনা শুরু হয়ে যায়, রাতে ওদের পছন্দের পজিশন নির্ঘাত ওম্যান অন টপ।

আমির খান মহাশয়ের বক্তব্যের পরেও আরেকবার তাই হলো। কিরণ রাও দেশে 'সেফ' বোধ না করলে যে দেশের অনেকানেক বীরপুঙ্গব তাঁকে সেই 'সেফটি' দিতে ইচ্ছুক এমন শোনা যায়। আমিরের চেয়ে কম বয়সী সঙ্গি বেছে নিতে পারলে নাকি তাঁর এমনটা মনে হতো না, কারণ এ কথা আমরা সকলেই জানি যে স্বামীর কাজই হলো স্ত্রী'র রক্ষাকর্তা হওয়া। যেখানে সানি লিওনির মতো গরম গণ-ভোগ্যা মহিলা এদেশে 'সেফ' কিরণ রাও-এর মতো 'সাধারণ' চেহারার মহিলা এদেশে কেন নিশ্চিন্ত বোধ করছেন না সেই নিয়েও প্রশ্ন শুনি। কিরণের ছোট চুল, ছোট বুক যে এদেশে কোনও পুং বিশ্বামিত্রকে টলাতে পারবে না, বুঝতে পারি।

শুধু মাঝেসাঝে, খুউউউউব মাঝেসাঝে (যেমন গত মাসে হলো দিল্লীতে) কিছু পুরুষের হাতে দুই-পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়ার সুযোগ পাই। ওদের একঢাল চুল, বিভঙ্গের ঢেউ, সুডৌল বুক, এসব ছিল?

Wednesday, July 15, 2015

বাহুবলে বাজিমাত

বাহুবলির টিকিট মূল্য হিসেবে আইনক্স ২৯০/- টাকা লুটে নিল। পুঁজিবাদকে গালমন্দ করতে করতে হলে ঢুকলাম এবং ঢুকেই বুঝলাম, আসলে আইনক্সের  বদলে সি এস লিউইস-এর নারনিয়ার সেই আলমারিতে ঢুকে পড়েছি যার ওপারের পৃথিবীতে গাছ-পাথর-জন্তু-অর্ধমানব-সিংহ কথা বলে, যুদ্ধ করে, রাজ্যশাসন করে।  প্রায় তিনঘন্টার  লম্বা সিনেমায়  বিভিন্ন সময়ে নিজের হাতে  চিমটি কেটে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে, মাছি ঢুকে যাবার মতো বড় হাঁ করে বসে থেকে  জানতে পারলাম গল্প শেষ হইয়াও শেষ হইল না। কারণ বাকিটা ব্রেক কে বাদ - ২০১৬ এ রিলিজ। অগত্যা হিসেব কষতে বসলুম।


  • ভায়াগ্রা জলপ্রপাত (নায়াগ্রার বাবা) - ১০০/- টাকা 
  • নায়কের প্রপাতারোহণ পতন ও পুনরায় আরোহণ- ৪০/- টাকা
  • ফর্সা টুকটুকে পেলব কাঁচুলি পরিহিতা নায়িকা - ৩০/- টাকা
  • ঝরনার আনাচেকানাচে উড়ন্ত প্রেমগান - ১৫/- টাকা
  • ট্রপিক্যাল জঙ্গল - ৭.৫০/- টাকা
  • গ্লেসিয়ার - ৭.৫০/- টাকা
  • বরফ ধস - ১০/- টাকা 
  • টোবোগ্যাগিং করে বরফ ধস কাটানো - ৫/- টাকা 
  • সি জি আই শহর - ২৫/- টাকা 
  • যুদ্ধ - ৩৫/- টাকা 
  • কাগজের তৈরি নকল হাত - ৫/- টাকা 
  • মানুষ বনাম সি জি আই ষাঁড়ের চোখধাঁধানো লড়াই - ১০/- টাকা 


willing suspension of disbelief - PRICELESS



Monday, June 29, 2015

আমেরিকার গর্ব আমার নয়

আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রগতিশীল দেশ, এমন ধারণা উপমহাদেশের কেউ কেউ সানন্দে পোষণ করেন। অথচ আমেরিকা সেই দেশ যাদের সিভিল রাইটস মুভমেন্টের পরে ভোট দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে কেটে গেছে এতগুলো দশক। মহিলা রাষ্ট্রপতি তারা স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও নির্বাচন করতে পারেনি। আমেরিকা এমন একটা দেশ যেখানে মৃত্যুদণ্ড স্বমহিমায় বহাল। আমেরিকা সেই দেশ যেখানে সংসদে (কংগ্রেস) মহিলা সদস্য ১৮% মাত্র। সর্বশেষে, আমেরিকা পৃথিবীর তেইশতম দেশ যেখানে সমকামী বিয়েকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এর আগে আরো বাইশটা দেশ এই পদক্ষেপ নিয়েছে, আমেরিকাকে এই বিষয়ে পথিকৃত কোনমতেই বলা চলে না।

অথচ কী আশ্চর্য, ফেসবুকের রামধনু রঙের জোয়ার দেখলে মনে হচ্ছে আমেরিকা সমকামী বিয়ের স্বীকৃতি দেওয়ামাত্র পৃথিবীর সমস্ত সমকামী/এলজিবিটি মানুষের স্বাধিকারপ্রাপ্তি ঘটে গেছে। ফেসবুকের সেলিব্রেট প্রাইড অ্যাপটি আমাদের শেখাচ্ছে আমেরিকার গর্বে গর্ব করে কিভাবে প্রোফাইলের ছবিটা রামধনু রঙে ঢেকে ফেললেই প্রমাণ হবে আমি সমকামীদের সমব্যথি/সহমর্মী। কিভাবে আমেরিকার সমকামীদের সাথে একাত্মবোধ করতে না পারলে আমার আলোকপ্রাপ্তি অসম্পূর্ণ থাকবে। আমেরিকা যেন পৃথিবীর প্রতীক, আমেরিকার সাফল্যেই জগতের সাফল্য। গ্লোবাল সিটিজেন হয়ে উঠবার প্রথম ও সর্বপ্রয়োজনীয় ধাপ, আমেরিকার সাথে একাত্মবোধ করা।

রাষ্ট্রপতি ওবামাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারার জন্য। মার্ক জুকারবার্গকে অভিনন্দন নিজের দেশের আইনব্যবস্থা/সরকারের গর্বে ছাতি ফুলিয়ে ফেসবুকময় রামধনু রং ছড়ানোর জন্য। তবে এ প্রশ্ন না করে থাকা যাচ্ছে না, যদি সসাগরা পৃথিবীর সমকামীদের অধিকারের ব্যপারে ফেসবুক এতটাই সচেতন, তাহলে আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ (যেখানে এখনও ভ্রুণহত্যা নিষিদ্ধ) সমকামীদের সমানাধিকারের স্বীকৃতি দিলে কেন তা নিয়ে কাউকে উচ্চবাচ্য তো দূর, মাথা ঘামাতেও দেখা যায় না!

গোটা ব্যপারটা আর তাতে উপমহাদেশের অত্যুৎসাহ দেখে মনে হচ্ছে চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান বলার পর এবার বলা হবে আমেরিকার গর্ব আমাদের গর্ব।

Thursday, June 25, 2015

রজঃস্বলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি...

অতঃপর পৃথিবী রজঃস্বলা হইলেন। মন্দিরদ্বার রুদ্ধ হইল। বিধবার অন্নব্যঞ্জন নিষিদ্ধ হইল। হলকর্ষণ মুলতুবি রইল। তথাপি একটি গূঢ় সমস্যার কোনরূপ সমাধান করিতে না পারিয়া ধর্মগুরুরা সভার আয়োজন করিয়া পরামর্শ করা স্থির করিলেন। সকল গুরুদ্বিগের প্রস্তাব শ্রবণ করিয়া মহাগুরু (ডান্স বাংলা ডান্সের সহিত ওঁর কোনও যোগাযোগ নাই) সিদ্ধান্তে উপনীত হইবেন, এমন প্রস্তাব লওয়া হইল। মহাগুরুর নাম জানিতে আমাদের কিয়ৎকাল প্রতিক্ষা করিতে হইবে।
সভাস্থলে গুরুরা সকলে একে একে নিজ নিজ প্রস্তাব রাখিতে লাগিলেন।
রক্ষী মহারাজ - ইহযাবতকাল ধরিয়া শুনিয়া মানিয়া ও বলিয়া আসিয়াছি, রজঃস্বলা নারি অশুচি, অপবিত্র। তাহাকে স্পর্শ করা অনৈতিক, অশুদ্ধ কর্ম হিসাবে চিহ্নিত হইবে। তথাপি, পৃথিবীর রজঃকালে আমরা কোন বিচারে ইহার পৃষ্ঠে কাল অতিবাহিত করিব? আমার প্রস্তাব, অম্বুবাচী চলাকালীন আমরা প্রত্যেকে বৃক্ষপৃষ্ঠে কাল অতিবাহিত করি। ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় ফলাহারের উপকরণ সাথে লইয়াই যাইব।
নবীন ধোকারিয়া - মহাগুরুদেব, ইয়ে অপরাধ নেবেন না। আমার স্যার সারা গায়ে বাত, এই বয়সে গাছে চড়তে গিয়ে প্রাণপাখিটি উড়ে গেলে অনেক সাধ আহ্লাদ অপূর্ণ থেকে যাবে। তার ওপর বৃষ্টি বাদল গরম এসব আজকাল আর সহ্য হয় না। আমি বরং আমার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লিমোতে থাকি? পৃথিবীর মাটিতে পাও দিতে হলো না, আবার পিঠও বাঁচল।
সাধ্বী কাঁচি - গুরুদেব, পৃথিবী, ধরিত্রী, আমাদের মাতা। মাতা কখনও অশুচি হতে পারে না গুরুদেব! মাতাকে অশুচি করে একদল বিধর্মী, বেজাতের মানুষ। আমার প্রস্তাব, এই রজোঃপর্বে, সকল বিধর্মীকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়া হোক। তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
ঘষারাম বাপু - ধরিত্রীর অশুচিতা লইয়া পুরুষদিগের কোনরূপ সমস্যা দেখিতেছি না। ধরিত্রীর রজোপর্বে সকল পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন মহিলার দেহে গমন করিলেই তাহারা অশুচিতা হইতে মুক্ত পাইবে এবং পুরুষদেহের ঈপ্সা পূর্ণ করিবার পুণ্যে উক্ত মহিলাগণও কোনরূপে কলুষিত হইবেন না।
এক্ষণে মহাগুরুদেব 'স্বামী চড়েন গদি' আপনার আসন হইতে পশ্চাদ্দেশ বিচ্ছিন্ন করিয়া দুই হস্ত সম্মুখে প্রসারিত করিলেন। সকল সভাসদগণ নিজ নিজ স্থানে দন্ডায়মান হইলে তিনি স্মিতহাস্য করিয়া বলিলেন, 'মিত্রোঁ, কতিপয় দিবস পূর্বে যে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের আয়োজন করাইলাম, তাহার হেতু তোমাদের হৃদয়ঙ্গম হয়নি দেখিতেছি। পাঁজি দেখিয়া বুঝিয়া শুনিয়াই তাহা করিয়াছিলাম। যোগাভ্যাসে আমরা জাতিগতভাবে বিশেষরূপে পটু। অতএব, অম্বুবাচীর পঞ্চ দিবস, যোগবলে ভূমিপৃষ্ঠ স্পর্শ না করিয়াই, শূন্যে ভাসমান হইয়া কাল অতিবাহিত করিব।  উক্ত স্টান্টের নামকরণ করিব - আসন শূন্য।