Sunday, May 17, 2015

ছাদ

গ্রীষ্মের রাতের এই এক মজা। এক একটা হাওয়ার ঢেউ আসে, আর চারপাশের সুপুরি নারকোল গাছের পাতারা সরসর ঝরঝর খরখর শব্দে দলে দুলে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। ঢেউ চলে গেলে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করে পরের ঢেউটার জন্য। কিন্তু লোহার সিঁড়ির রেলিং ধরে বেয়ে ওঠা বিলিতি ফুলের গাছের সেসব উত্তেজনার বালাই নেই। পায়ের তলায় অল্প মাটি। ওর রেলিং ধরে বাঁচা। তাই নির্লিপ্তি প্র্যাকটিস করছে। ঝড় বাদল কালবোশেখি শিলাবৃষ্টি দখিনা বাতাস সবেতেই তিরতির তিরিতির করে কাঁপে। সে কাঁপুনিতে উল্লাসও নেই, উত্তেজনাও নেই, উন্মাদনাও নেই। শুধু নিজের বাঁচটুকুতে কনসেন্ট্রেট করেছে। আর আমি রাতে ছাদের লোহার সিঁড়িতে বসে হাওয়া খাই। কয়েকধাপ নীচে সিমেন্টের মেঝেতে, আলসেয় বসে সাইকাস, বেল, জবা, গোলাপ, নয়নতারা, ফার্ন, লিলি, লাল ফুলওয়ালা ক্যাকটাসের ছোট, বড়, মাঝারি, চ্যাপ্টা, লম্বাটে, গোলাকার মাটির টব, চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঘুমোয়, মাঝে উসখুস করে, থম মেরে ঘাড় গুঁজে হাইওয়ের ধুলোর মতো জমতে দেয় গায়ে অন্ধকার চিরে ছড়িয়ে পড়া উঁচু বাতিস্থম্ভের জোরালো সাদা আলো। দূরে দূরের কোনো ছাদে সিগারেটের লাল আগুন কমছে বাড়ছে, ঘোরাফেরা করছে স্মার্টফোনের আলো। কথা বলার, আগুন ছোঁয়ার বেয়াড়া অভ্যেসে রাত জাগছে পায়চারীর ছাদ।

হয়ে গেল চশমা



সঃ আজ বাজার খুব খারাপ।

অঃ কত গেল?

সঃ হাজার দেড়েক।

অঃ ও মেকআপ হয়ে যাবে। খেয়াল রাখিস লস যেন পাঁচ হাজার না ছাড়ায়।

যঃ কাল ছোট মাসি ফোন করেছিল। ছেলের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ওর বিয়েতে কিন্তু ভালো কিছু দিতে হবে মনে রেখো। আমাদের মাইক্রোওয়েভ দিয়েছিল। অন্তত হাজার পাঁচেক বাজেট ধরে রাখো। আমিও কিছু দেব, চিন্তা কোরো না।

লঃ হুম।

যঃ কী হল?

লঃ কই কিছু না তো। শুনলাম।

যঃ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ওমনি শুনে নিলে? কী করো বলত সারাক্ষণ? কার সাথে এত কথা বলো? আমি কি কিছুই বুঝি না ভাবো?

লঃ যাহ বাবা! চোখ দিয়ে তো শুনি না। কান দিয়ে শুনি। যা বললে শুনে নিয়েছি। তোমার ছোট মাসির ছেলের বিয়ে। গিফটের বাজেট পাঁচ। শান্তি?

গঃ হ্যালো। কেমন আছিস?

ফঃ এই তো চলছে, বল।

গঃ শোন না, একটা দরকারে ফোন করলাম। মাইক্রোওয়েভে ভাপা ইলিশ করতে হলে কতক্ষণ সময় দেওয়া উচিৎ রে?

ফঃ পাঁচ মিনিট।

কঃ এই তোমার পাঁচ মিনিট? সবসময় এত ঢপ দাও কেন বলো দেখি? মোবাইল ফোনে কথা বলা মানেই ঢপ? এই নাকি তুমি অটো থেকে নামছ?

পঃ আরে! সত্যিই। লাস্ট মোমেন্টে সিগনাল খেয়ে গেলাম। নইলে পাঁচ মিনিটই লাগত। মাইরি বলছি। তোমার গা ছুঁয়ে বলছি।

কঃ আমার গা ছোঁয়ার জন্য আজকাল তোমাকে এসব ভুলভাল বাহানা দিতে হচ্ছে বুঝি?

রঃ একজন কাউকে ছুঁয়ে থাকতে হবে।

টঃ একটা ঠান্ডা দেহ, কে ছুঁয়ে থাকল কি থাকল না তাতে আর কার কিই বা যায় আসে বলত? শেষ তো সেই আগুন, সেই গঙ্গায়। এসব ফুল ধূপ আতরেরই বা কী দরকার!

রঃ আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি। তুই কিচ্ছু চিন্তা করিস না। পা টা ছুঁয়ে বসে থাক শুধু। আর কাকিমাকে বলিস একটু লোহা, নিমপাতা, আগুন আর মিষ্টির আয়োজন করে রাখতে। শ্মশানযাত্রীরা ফিরলে লাগবে।

শ্মশানযাত্রীরা সদলবলে একটা মানুষকে আগুনের দিকে ঠেলে দেবে বলে মহাসমারোহে কাঁধে তুলে নেয়, হরিবোল দিতে দিতে, খৈ আর খুচরো পয়সা ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে চলে, গাড়িঘোড়া লোকজন তাদের সসম্ভ্রমে রাস্তা করে দেয়, কেউ কেউ কপালে হাত ছোঁয়ায়, আর কেউ মৃতদেহ দেখবে না বলে অন্য দিকে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় চট করে। ঘাটের পুরোহিত ডোম, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। শ্মশানের এক কোণে একটা ঝুপড়ির সামনে এক বিহারি দম্পতি একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে বসে আছে সকাল থেকে। গঙ্গায় চান করে ভিজে কাপড়ে বসে আছে ওরা। খালি পেটে। পাগলা বাবার আদেশে। ওই একটা মড়া এলো।

র: ওই বুড়োটা কী করে রে?

জ: শুনেছি মৃগী টিগি সারিয়ে দেয়। মন্ত্রপূত লিট্টি খাইয়ে। সবাই পাগলা বাবা বলে ডাকে।

র: সব শালা ভন্ড।

চঃ সব পাখি মাছ খায় আর নাম হয় আমার! বাড়িতে নিজের ঘরে বসে লুকিয়ে বিলিতি মারলে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কারুর, আর আমি সপ্তাহে একদিন মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলেই বাওয়াল? ধুসসালা ভাল্লাগে না...।

ষঃ ওরা বাড়িতে বসে খায়। রাস্তায় রিক্সাওয়ালার সাথে খুচরো নিয়ে বচসা করে পাড়া মাথায় করে লঙ্কাকান্ড বাধায় না।  

খঃ লক্ষ্মী মেয়ে উঠে এসো। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর টর বাধালে একটা কান্ড হবে। ফাল্গুন মাস!

হঃ (গান) একে তো ফাগুন মাস দারুণ এ সময়, লেগেছে বিষম চোট কী জানি কী হয়…

ছঃ আমি তোমার কাছে, সময় ছাড়া আর কিচ্ছু কোনদিন চাইব না।

ঘঃ হ্যাঁ বরাবরই তোমার দামী জিনিসের দিকেই নজর, জানি।

ভ: একটা ক্রিমের দাম আটশো টাকা! এত দামী ক্রিম হয়!

শ: এটা এন্টি এজিং ক্রিম। এগুলো একটু দামিই হয়। তুমি এসবের কী বোঝো শুনি? আর তোমার টাকায় তো কিনিনি। তোমার এত মাথাব্যথা কীসের?

ড: নিজের টাকায় তো কিনেছ? কষ্ট করে উপার্জন করা টাকায়। এভাবে নষ্ট করার কোনো মানে হয়?

শ: আর তুমি যে তোমার কষ্ট করে উপার্জন করা দিনের পর দিন ইনভেস্ট করার নামে নষ্ট করছ তার বেলা? কোনদিন তো লাভ করেছ বলে শুনলাম না।

ড: ওটা আর এটা এক?

শ: হ্যাঁ। ওটাও বাজার। এটাও। তুমিও খদ্দের, আমিও।   

Wednesday, April 1, 2015

দীপিকা, ক্লিভেজ এবং তাঁর choice

দীপিকা পাডুকোনকে আমার দারুণ লাগে। কী মিষ্টি দেখতে। কী লম্বা। কী সুন্দর গালে টোল পড়া হাসি। অভিনয়ও নেহাৎ মন্দ নয়। তবে এ কথাও সত্যি, ওঁর অভিনয়ের চেয়ে রূপের আমি বেশি ভক্ত। তাই, ফ্যাশন ব্লগে দীপিকার appearance দেখব বলে মুখিয়ে থাকি। সিনেমার প্রোমশনে, পার্টিতে, এয়ারপোর্টে দীপিকা কী পোষাক পরলেন, কিরকম মেক আপ করলেন, কী কী গয়না পরলেন এসব দেখতে, মাপতে, ফলো করতে বেশ লাগে।

কয়েকমাস আগে দীপিকাকে ঘিরে একটা বিতর্ক হয়। বলা ভালো, দীপিকার ক্লিভেজ ঘিরে। কোনও এক আন্তর্জালিক পেজ থ্রি ওয়েবসাইট দীপিকার ক্লিভেজের ছবি দেখিয়ে একটি ছবি প্রকাশ করে যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দর্শকের দৃষ্টি তাঁর ক্লিভেজের দিকে আকর্ষণ করার। এবং সেই নিয়ে দীপিকা ভয়ানক অপমানিত বোধ করে সেই মর্মে কিছু বক্তব্য রাখেন। এখানে দুটো কথা বলার আছে -

১। দীপিকার মতন কৃশকায়া মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়, তাঁদের স্তন এবং নিতম্ব ঠিক ভারতীয় পুরুষের পছন্দমাফিক হয় না। কিন্তু দীপিকা যেহেতু নায়িকা, এবং তাঁর সৌন্দর্য্যের মূল কনসিউমার পুরুষ, তিনি নানাবিধ enhancement pad এর সাহায্যে নিজের দেহ আরও রমণীয় করে তোলার চেষ্টা করেন এবং বলা বাহুল্য, সফলও হন। অর্থাৎ, পুরুষতন্ত্রের সৌন্দর্য্যের ব্যাখ্যা মেনেই সাধ্যমত সাজিয়ে তোলেন নিজেকে।

২। এই বিতর্কটা ঠিক তাঁর ছবি ফাইন্ডিং ফ্যানি রিলিজ করার আগেই হয়।

অন্যান্য নানা ফ্যাশন ব্লগ, পেজ থ্রি সাইটে দীপিকার পা, তাঁর বিভঙ্গ ইত্যাদির উল্লেখ করে বহু ছবি বহুবার দেখা গেছে এবং এখনও যায় যেগুলো নিয়ে তাঁকে বিশেষ মাথা ঘামাতে শুনি না।

এবারে আসা যাক vogue পত্রিকার তৈরি It's my choice ভিডিওটার কথায়। এই ভিডিও তে দীপিকা বলেছেন নারীর অধিকারের কথা। ইচ্ছেমতো যৌন সংসর্গ করার স্বাধীনতার কথা, যখন ইচ্ছে বাড়ি ফেরার স্বাধীনতার কথা, বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কে লিপ্ত হবার স্বাধীনতার কথা, ইচ্ছেমতো পোষাক পরার স্বাধীনতার কথা, ইত্যাদি। যেগুলো বলেননি, সেগুলো হলো কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের স্বাধীনতার কথা, যেমন ইচ্ছে জীবিকা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতার কথা, হাউসওয়াইফ হয়েও স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকারের কথা, মেয়ে হয়েও পড়াশোনা করার অধিকারের কথা, ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ভিডিও রিলিজের সময়ও কাকতালীয় গুণে তাঁর আরেক ছবি 'পিকু' রিলিজের সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে।  আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো vogue এমন একটি পত্রিকা যারা মাসের পর মাস তাদের প্রচ্ছদে পুতুলের মতো মডেলদের সাজিয়ে, ফটোশপের সাহায্যে ইচ্ছেমতো সেই মডেলদের রোগা এবং ফর্সা করে তাঁদের 'গ্রহণযোগ্য' করে তুলে বাজারে প্রকাশ করে।

এখন প্রশ্ন হলো, বলিউডের নামী অভিনেত্রী, যিনি প্রতি পদক্ষেপে নিজেকে পুরুষ দর্শকের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছেন (by choice), তাঁর মুখের এ হেন নারীবাদী বুলি আমরা ঠিক কতটা সিরিয়াসলি নেব? নাকি অপেক্ষা করব সেই দিনের, যেদিন দীপিকা তাঁর দৈহিক প্রোপর্শনের তোয়াক্কা না করে, মেকআপের তোয়াক্কা না করে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন এক রক্তমাংসের নারী হয়ে।



Tuesday, March 24, 2015

ইন্দ্রিয়সুখ

সারি সারি হলুদ ম্যাগির চেন ঝোলানো মনোহারি দোকান, বনেট খুলে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো খৈনি টেপা ট্যাক্সিওয়ালা, পান বিড়ির গুমটি, গলির জটলা চোখের পাশ দিয়ে সরে সরে যায়। উত্তম-সুচিত্রার বাইকগানের প্রেক্ষাপটের মতন। সিগনালপোস্ট রাগি চোখ লাল করে পথ আটকায় একদল হলুদ সবুজ অটোর। রাস্তা পেরতে দেয় না।

হঠাৎ হাওয়ার দমকে উড়ে যায় কবির মিউজের বুকের আঁচল। জল ছেটানো রজনীগন্ধা, এগরোল চাটুর পোড়া তেল, গেরস্তের কালোজিরে ফোড়ন, সর পড়া ফুটন্ত দুধ, বেনারসি জর্দার উগ্র গন্ধ এসে লাগে নাকে।

দূরের মিটিং এর মাইক জবাব চায় সরকারের কাছে। কন্ডাকটর শুনিয়ে দিয়ে যায় খালি সীটের হদিশ। উলোঝুলো পাগল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উদ্দেশে ছুঁড়ে দিতে থাকে দুই তিন চার অক্ষরের অভিযোগ। ব্যস্তবাগীশ অটোর হর্ন ছুটে এসে ঢুকে পড়ে কানের গর্তে। ছুঁড়ে ফেলা এঁটো ভাঁড় আছড়ে পড়ে খং করে ভেঙ্গে ছিটকে গিয়ে লাগে নেড়ি কুকুরের পেছনের পায়ে। চমকে কেঁউ কেঁউ করে কেঁদে ওঠে পাড়ার ভুলু। হকারের এফএমে মাখনগলায় হেমন্ত বলে ওঠে 'সুন যা দিলকি দাস্তাঁ'।

ঘেমে পিঠের চামড়ায় লেপ্টে যাওয়া জামায় হাওয়া লাগে। মুহুর্তে শিরশিরানি নামে শিরদাঁড়া বেয়ে। কাঁটা ফুটে ওঠে সারা গায়ে। কিছুক্ষণ আগেই উপুড় করা কালো কফির তিতকুটে পরত ছড়িয়ে জড়িয়ে থাকা জিভ ঠোঁট চেটে খুঁজে পায় লিপস্টিকের চেনা স্বাদ।

একটা গোটা শহর রক পাখীর মতো উড়ে এসে প্রকান্ড ডানায় ঢেকে ফেলে শরীরের শিরা, উপশিরা, দাগ, খাঁজ, ভাঁজ ঢেউ। অযথা আদর করে।



Wednesday, March 18, 2015

মুখ এবং বুক

বহু বছর হল মুখ বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেছে। এবার বুক ঢাকার পালা। উঁহু এ বুক সে বুক নয়। এ হল book। ফেসবুক নামের যে তরঙ্গে ভেসে আমরা নিরন্তর ছুঁয়ে চলেছি ভিনদেশের, ভিনবাড়ির, ভিনজগতের জীবন তাদের ভাগ করে নেওয়া ছবির, স্ট্যাটাসের, লেখার মাধ্যমে; চ্যাট বাক্সে যাদের বলছি রাতের মেনু, কলেজের কেচ্ছা অথবা আগ্রহভরে শুনছি বিয়ে ভাঙ্গার গল্প - একদিন হঠাৎ ঠিক করলাম, এসবের থেকে বিরতি নেওয়ার দরকার। আর ভদ্রমহিলার যেহেতু এক কথা, তাই কয়েকটা ক্লিক পরপর করে, অ্যাকাউন্টখানা deactivate করে দেওয়া গেল। মেইলের বাক্সে, এসএমএস-এ কয়েকটা প্রশ্ন ছুটে এল আমার কী হয়েছে জানতে। খুচরো বৈরাগ্য শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরেও গেল।

আসলে সত্যি যদি তেমন বলার মত কিছু হতো, মানে বেশ মুখরোচক কিছু - যেমন ধরুন হঠাৎ রাস্তায় পেয়ে কেউ রেপ করল, অথবা অ্যাসিড ছুঁড়ে পুড়িয়ে দিল চাঁদমুখ, অথবা কুপিয়ে খুন করে গেল, অথবা লিম্ফোসারকোমা অফ দ্য ইন্টেস্টাইনের প্রকোপে বেঘোরে প্রাণ গেল, তাহলে কিন্তু আয়েশ করে বাড়িতে বসে মাউস টিপে টিপে deactivate করে উঠতে পারতাম না প্রোফাইলখানা। উল্টে আমার অবর্তমানে সেখানা আমার স্মৃতিসৌধ হয়ে জ্বলজ্বল করত আন্তর্জাল প্রান্তরে। রাশি রাশি ছবি, লেখা, লোকদেখানো আদিখ্যেতা পড়ে থাকত একা - লোকজন মাঝে মাঝে ঢুঁ মেরে যেত, কমেন্ট পড়ে পড়ে বুঝে নিতে চাইত প্রেম অপ্রেম বিষাদ আহ্লাদের হদিশ। হয়তো ভাবত আহা কেমন চ্যাট আলো করে থাকত গো, কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল...চুক চুক! হয়তো ভাবত না। টাইমলাইনে এসে হয়তো লিখে যেত তুমি যেখানেই থাকো ভালো থেকো, তোমার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি, সব ঝড় কেটে যায় একদিন...এও যাবে। হয়তো যেত না। হয়তো সুর্যোদয়ের, মেঘের, গোলাপের ছবিতে ছয়লাপ করে দিত, বা দিত না।

এদিকে কবি সেই কবেই অভিযোগ করে গেছেন - শরীর শরীর তোমার মন নাই? অথচ আমাদের দেখুন, শরীরের নাগাল পাই না, ছবিকেই শরীর বানাই, মনের নাগাল না পেয়ে স্মাইলি জমাই। মুখে বুকে আঙুল বোলাতেই চালাক ফোনের থেকে একরাশ রঙিন ধোঁয়া বেরিয়ে এসে গড়ে তোলে অবয়ব। বিজন ঘরে নিশীথ রাতে সকলেই ঢুকে পড়ি শূন্য হাতে।


Monday, March 9, 2015

আপনার হিরো ওয়ার্শিপের প্রয়োজন মেটানোর দায় নির্ভয়ার নয়

রোজ একই বিষয় নিয়ে লিখতে ভালো লাগে না। কিন্তু তাও মাঝেমাঝে বাধ্য হই। আন্তর্জাতিক মহিলা দিবসে এনডিটিভি খুলে দেখলাম একটা প্রদীপ জ্বলছে, তার পাশে ফুলের মালা, লেখা রয়েছে India's Daughter- হিসেব মতো এ দৃশ্য দেখে আমার চোখে জল আসার কথা। আবেগে গলা বুঁজে আসার কথা। নির্ভয়া তোমাকে আমরা ভুলছি না ভুলব না গোছের স্লোগান তোলার কথা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এর কোনটাই হলো না। ছবিটা দেখে প্রথমেই মনে পড়ল দিল্লির অমর জওয়ান জ্যোতির কথা। যেকোনো শহীদকে আমরা এভাবেই মনে রাখি। কিন্তু, নির্ভয়া কি শহীদ? শহীদের অহংকার কি সে চেয়েছিল?

যে মেয়েটা আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে বেঘোরে প্রাণ দিল, তাকে আমরা শহীদ বানালাম কোন মুখে? তার মৃত্যুর দায় তো আমাদের প্রত্যেকের। আমরা যারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নারী শরীর পুরুষের ভোগের বস্তু এই মনোভাব কে প্রশ্রয় দিই, যারা prevention is better than cure থিওরি মেনে নিজেকে একটু বেশি ঢাকি, যারা অধস্তন মহিলা কর্মচারীকে স্লিভলেস ব্লাউজ পরে অফিসে আসতে বারণ করি, তাদের সকলের। নির্ভয়া আমাদের লজ্জা। আমাদের ব্যর্থতার মুখ। সঙ্কির্ণতার মুখ। পৈশাচিকতার মুখ। তাকে শহীদ বানিয়ে ফেললেই কি সেই দায় নেমে যাবে কাঁধ থেকে?

নির্ভয়াকে আমাদের একজন victim  হিসেবেই মনে রাখতে হবে। শহীদের গৌরবের মোড়কে তাকে ঢাকলে কি আর এই লজ্জা ঢাকা যাবে? মুকেশের শাস্তি অথবা সংশোধন, তথ্যচিত্র ব্যান করার যৌক্তিকতা, ফাঁসী কাম্য না যাবজ্জীবন, এসব বিতর্কে নাহয় নাই বা গেলাম।

শুধু বলব, একজন বেতনভুক সরকারি যোদ্ধার সঙ্গে নির্ভয়াকে গুলিয়ে ফেলবেন না। আপনার হিরো ওয়ার্শিপের প্রয়োজন মেটানোর দায় নির্ভয়ার নয়। নির্ভয়া আমাদের লজ্জা। প্রশাসনের, সমাজব্যবস্থার, রাষ্ট্রের, শিক্ষাব্যবস্থার,  আমার, আপনার।

Monday, March 2, 2015

কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়!


আমার নাম নির্ভয়া নয়। সৌভাগ্যবশত, আমাকে কেউ কোনদিন রেপ করেনি। যৌনাঙ্গে লোহার রড ঢুকিয়ে মেরে ফেলেনি। আমার অপরাধীদের শাস্তির দাবীতে ধর্নাও দেয়নি। শুধু একটু আধটু গায়ে হাত টাত দিয়েছে রাস্তাঘাটে। তবে সেসব তো জলভাত। কবি তো আগেই বলে দিয়েছেন, আপনা মাংসেই হরিণা বৈরি হবার কথা। বানভাসি কন্যার জীবনভোর সর্বনাশ হবার কথা। ঐসব বলে তাই খামোকা আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করব না। বরং 'সভ্য বদ্র পোষাক' পরে লেডিজ কম্পার্টমেন্টে চড়াই শ্রেয়। তাছাড়া আজকে নির্ভয়ার কথাই বলা দরকার। কারণ আর কিছুই নয়, নির্ভয়া কান্ডে শাস্তিপ্রাপ্ত জনৈক যুবক সদ্য তার অসহায়তার কথা এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে। তার প্রতি আমার গভীর সমবেদনা জেগে উঠেছে। 

সত্যিই তো। কোনও ভদ্র মেয়ে কি রাত নটায় এক পুরুষ বন্ধু সাথে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়? নাকি ধর্ষিত হবে বুঝতে পেরে সেই কাজে বাধা দেয়? নাকি অভব্য পোষাক পরে বাড়ি থেকে বেরোয়? মেয়েরা যখন জানেই, তাদের শরীর পুরুষের ভোগবিলাসের উপাদান, সেইমতো চলাই তাদের উচিৎ। অযথা সাঁকো নাড়ালে যা হবার তাই হয়। দু পায়ের ফাঁকে হামলে পড়ে পৌরুষের বজ্রনির্ঘোষ। খোয়া যায় মান, সম্মান, প্রাণ। প্রাণ গেলে অবশ্য এক দিক থেকে ভালোই, কারণ তাহলে আর ভগ্ন সম্মানের বোঝা বয়ে বাকি জীবনটা বেড়াতে হয় না। উলটে শহীদের মর্যাদা জোটে কপালে। মোমবাতি মিছিলও। আর উপরি পাওনা হিসেবে কখনো আত্মীয়স্বজনের চাকরি, আর্থিক অনুদান (ক্ষতিপূরণও বলতে পারেন) ইত্যাদি। এক কথায়, সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস যাকে বলে। আর এইসব সাত পাঁচ ভেবেই নির্ভয়ারা জিন্স টপ পরে, রাত করে বাড়ি ফেরে, পুরুষবন্ধুর সাথে খোলামেলাভাবে মেশে। শুধুমাত্র ধর্ষিত হবার আশায়। 

আর তাই আমরা, আমরা যারা রেপড হইনি বা করিনি বলে যথাক্রমে প্রিভিলেজড ও এনলাইটেন্ড, তারা নির্ভয়ার দোষীদের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই সোশ্যাল মিডিয়ায়। মৃত্যুদন্ডের মতো পৈশাচিক আইনের নিন্দা করতে। আর যে বেচারা লোকটা শুধুমাত্র এক মহিলার শরীর ভোগ করতে চেয়ে তার কাছে বাধা পেয়ে তাকে নির্যাতন করতে বাধ্য হয়, সে বিদেশী চ্যানেলকে বলে, "মহিলারাই ধর্ষনের জন্য বেশি দায়ী পুরুষদের চেয়ে।" 



নির্ভয়া আর অভিজিৎ রায়ের ভাগ্য একই গোত্রের। এই ভদ্রলোককেও সুখে থাকতে ভূতে কিলিয়েছিল কোনো এককালে। নইলে কি আর সে যেচে পড়ে ধর্মের সমালোচনা করতে গিয়ে মারা পড়ল? সে দায়ও কিন্তু তাকেই নিতে হবে। কারণ, যে বা যারা তাকে কুপিয়ে মারার পবিত্র কর্তব্য পালন করেছে তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা, মানসিক গঠন, তারা সংখ্যালঘু না গুরু, ইত্যাদির চুলচেরা বিচার করাই সর্বাগ্রে কাম্য। নিন্দা করা কিম্বা শাস্তির দাবী, গৌণ। আহা খুনি বলে কি মানুষ নয়! তাদের কি শখ আহ্লাদ স্পর্শকাতরতা থাকতে নেই?  মৌচাকে ঢিল ছুঁড়লে হুলের বিষ সহ্য করতে জানতেই হবে। 

বাড়ির বাইরে পা ফেলার আগে বা কলম ধরার আগে এ কথা মাথায় রাখতেই হবে, যে কোনো বিসদৃশ ঘটনার জন্য, কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।