জে এন ইউ বিতর্ক চলাকালীন ইনফোসিস-এর এক প্রাক্তন হোমরা, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন আম আদমির ট্যাক্সের টাকায় পড়াশুনো করা ছেলেপিলের দল পড়াশুনো না করে আন্দোলন করলে তা আমি মোটে সহ্য করব না। ভাইলোগ, বলতেই হচ্ছে বক্তব্য মে দম হ্যায়। সত্যিই তো, আমার রক্ত ঘাম জল করা টাকা তো আর কারুর বাপের সম্পত্তি নয় যে তা নিয়ে ঝান্ডাবাজি করা হবে? তবে কিনা এই পোড়া দেশে, আমার আপনার ট্যাক্সের টাকায় বেড়াল পায়রার বিয়ে দেওয়া ছাড়া আর প্রায় সবই হয়। কীরকম? আসুন কয়েকটা নমুনা দেখা যাক।
১। নেতার খাইখরচ - সরকারী তথ্য অনুযায়ী, সরকার এম এল এ পিছু প্রতি মাসে খরচ করে ২,৭০০০০ (দু লাখ সত্তর হাজার) টাকা। মাস মাইনে, দৈনিক ভাতা, কেন্দ্রের খরচ ছাড়াও, আছে বিনামূল্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ, গাড়ির জ্বালানি, বাস ট্রেনের বিনা টিকিটে যথেচ্ছ যাতায়াতের সুবিধা, বছরে চৌত্রিশটা প্লেনের টিকিট, গোটা পরিবারের চিকিৎসার খরচ, ইত্যাদি। ৫৪৩ জন সদস্যের ট্রাভেল রিইম্বার্সমেন্ট-এ সরকারের বছরে খরচ ৮৩ কোটি টাকা। বলা বাহুল্য এই দেশপ্রেমী সৈনিকদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা স্কুলের গন্ডিটুকুও পেরোননি। তাতে যদিও তাঁদের রাজনৈতিক যোগ্যতার বিচার হয়য় না, তবুও বলতে ইচ্ছে হলো তাই বললাম।
২। সামরিক খচ্চা - সেপ্টেম্বর ২০১৫ মাসে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বিভিন্ন সামরিক খাতে সরকারের খরচ ২২৯০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাইনেকড়ি, খাওয়া দাওয়া, গোলা বন্দুক এসবের খরচ আছে।
৩। সি এস ডি ক্যান্টিন - দেশের যারা সেবা করেন, তাদের পালটা সেবা করতে সি এস ডি নামে একটি বস্তু আছে। সি এস ডি-র পুরো নাম হলো ক্যান্টিন স্টোর্স ডিপার্টমেন্ট। এই সি এস ডি কী করে? জলের দরে খাবার, মদ, টিভি ফ্রিজ, পাখা, জামা, জুতো, সুটকেস, সানগ্লাস, স্যানিটারি ন্যাপকিন, গাড়ি, এসব বিক্রি করে সেনা, বায়ুসেনা, বিএসএফ, গান এন্ড শেল ইত্যাদি সামরিক-আধা সামরিক দপ্তরের কর্মচারিদের। ২০১০-১১ এর হিসেব অনুযায়ী সিএসডি ক্যান্টিনের জিনিস্পত্র কেনাকাটার জন্য সরকার বছরে ৫০০০ কোটি টাকা খরচ করে ক্যান্টিন প্রতি। এরকম ৩৪টা বড় ক্যান্টিন আছে সারা দেশে। সেইসব ক্যান্টিনের অধীনে আবার আরও অনেক ক্যান্টিন। এই নীচুতলার ক্যান্টিন ৪-৫% দাম বাড়িয়ে কর্মচারীদের তা বিক্রি করে। এই যে বাড়তি ৪-৫% মুনাফা, তার কী হয় কেউ জানে না। উল্লেখযোগ্য, সিএসডি-এর কোনও অডিট হয় না। আমার আপনার চেনা অনেক মদ স্মাগলার আছে, যারা ১৮০০/- টাকার মদ ১৩০০/- টাকায় বেচে। জানবেন তারা বিভিন্ন দেশভক্ত সামরিক কর্মচারীর বদান্যতায় ৭০০-৮০০ টাকায় সেগুলো কেনে।
৪। প্রজাতন্ত্র দিবস - ২০১৪ সালে সাজুগুজু করে মন্ত্রী সান্ত্রী লেঠেল বাগিয়ে, অস্ত্রাগার খুলে প্রতিবেশির মনে ভয় আর দেশবাসীর মনে ভক্তির সঞ্চয় করতে যে চার ঘন্টার লাচ প্ররিবেশিত হয়েছিল নিয়মমাফিক রাজপথে, তাতে সরকারের খরচ হয়েছিল ৩২০ কোটি টাকা।
৫। বিবিধ - এই যে যিশু ঠাকুর জন্মেছিলেন বলে গোটা পার্ক স্ট্রীট আলোর মালায় সেজে ওঠে, আচমকা শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের নাম পালটে শোভাবাজার সুতানূটি করায় স্টেশনের সব নিয়ন বোর্ড পালটে ফেলতে হয় রাতারাতি, অমুক তমুককে সম্বর্ধনা দিতে হয় সোনার মুকুট মেডেল দিয়ে, বিজয় মাল্যকে লোন পাইয়ে দিতে হয় যাতে ষাট নম্বর জন্মদিনটা হেব্বি কেতায় গোয়ায় পালন করতে পারেন, এসবই ভাইয়ো বেহেনো আমাদের টাকায় হয়। আর ওই যে স্মৃতিজি ওনার আগুন ভাষণে বললেন না, ওনার কোটায় কাদের কাদের ক্যান্ডিডেটকে সীট পাইয়ে দেন? হ্যাঁ ওসবও হয়। জাতীয় কোটায় পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে না পেলেও, মন্ত্রীর কোটায় বড়লোকের ৪০% পাওয়া ছেলেমেয়েও দিব্যি ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে পড়তে পারে।
সরকারের কী ভাগ্যি বলুন তো! আমার আপনার মতো বেহেড গবেটে দেশটা ভরে গেছে বলেই না ঘাস বিচুলি যা পারে খাইয়ে দেয় আর আমরাও পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে জাবর কাটতে থাকি।
Thursday, February 25, 2016
Tuesday, February 9, 2016
জাতপাত সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি আগেই জানতাম কিন্তু বলিনি
১
দলিত-নিগ্রহ বা 'নিচু' জাতের লোকজনকে অহেতুক হ্যাটা করার দৃশ্য আমি সত্যিই কোনদিন দেখিনি। দেখবই বা কিকরে? আমার আত্মীয়স্বজন-এর যাদের বেছে নেবার কোনও অপশন আমার কাছে ছিল না, প্রত্যেকের পদবী মোটামুটি - ব্যানার্জী, মুখার্জি, ব্যানার্জী, ব্যানার্জী, মুখার্জি, ভট্টাচার্য, রায়, গোস্বামী, বসু...পেয়েছি পেয়েছি একজন বসু আছে। হ্যাঁ আমার এক মাসতুত দিদির বরের পদবী বসু। নামের শেষে বসু আছে এমন একজনকে মেয়ে বিয়ে করবে মনস্থ করেছে শুনেই মাসি শয্যা নিয়েছিলেন। বহুদিন কেন্দ্রীয় সরকারে কর্মরত কায়স্থ জামাইয়ের মুখদর্শন করেননি। জীবনের শেষ দশ বছর অবশ্য দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁকে এই বসু পরিবারের সঙ্গেই এক বাড়িতে কাটাতে হয়। সে যাকগে যাক। এবারে আসা যাক আমার বন্ধু তালিকায়। অর্থাৎ যাদের আমি যেচে আমার জীবনের অংশ করেছি। তাদের পদবীগুলো মোটামুটি এইরকম - ব্যানার্জী, চক্রবর্তি, ভট্টাচার্য, পাল, গুহ, দত্ত, দাশগুপ্ত, নাথ, মুখার্জি, অধিকারী, বিশ্বাস, বসু, রায়চৌধুরী, ব্যানার্জী, গাঙ্গুলি, মন্ডল, মিত্র, কর্মকার, সরকার, আগরওয়াল, পান্ডে, নারায়ানন, বাগ, লাহিড়ি, চৌধুরী, রায়, চ্যাটার্জি। হ্যাঁ এক দু পিস বাদে সবই সৎ ব্রাহ্মণ। নিদেনপক্ষে কায়েত। আমি বেছে বেছে বর্ণহিন্দুদের সঙ্গেই দোস্তি পাতিয়েছি এমনটা ভাবতে প্রথমটায় খুব আত্মগ্লানি বোধ হলো। তারপর সেটা খন্ডাতে একটা অকাট্য যুক্তি বের করলাম। এই যে সব বন্ধুবান্ধবের দল, এদের আমি পেলাম কোথায়? কাউকে স্কুলে, কাউকে কলেজে, কাউকে ইউনিভার্সিটিতে, কাউকে অফিসে, কাউকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। এই মোটের ওপর বন্ধু কালেকশনের ঠেক। এবারে বন্ধুত্ব পাতাতে গেলে তো আর আমি পদবী দেখে পাতাইনি? পালকের রঙ দেখে পাতিয়েছি। এখন এইসব জায়গায় যে আমি বেশি বেশি করে 'নিচু' জাতের মানুষ খুঁজে পাইনি, বা বলা ভালো প্রায় সবই বর্ণহিন্দু পেয়েছি তার দায় কি আমার, না আমার পূর্বপুরুষের না বেদের না সংবিধানের শুনি?
২
লক্ষ্মী'র পদবী আমি জানিনা। লক্ষ্মী বিহারি। পৌরসভার ঝাড়ুদারনি। সপ্তাহে একদিন ফ্রি ল্যান্স আমার বাড়ির দুটো বাথরুম আর ড্রেন পরিষ্কার করে দিয়ে যায় সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে। এছাড়া রোজ আমার বাড়িতে ওর কাজের ব্যাগটা রেখে যায়। ডিউটি শেষ করে ফেরার সময় তুলে নিয়ে যায়। লক্ষ্মী আমার মা কে 'মা' আর আমাকে আমার ডাকনাম ধরে ডাকে। আমি দরজা খুলে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত কায়দায় টুক করে 'ও যেন আমাকে টাচ না করে' স্টাইলে ভেতরে ঢুকে যায়। আর মাসের শেষে টাকা নেবার সময় দু হাত জড়ো করে আঁজলা পেতে দাঁড়ায়। আমি কিন্তু ওকে এসব করতে শেখাইনি। শুনেছি পৌরসভার কর্মী হবার সুবাদে ওরা এখন খুব খারাপ মাইনেকড়ি পায় না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যপার, অঞ্চলে বহু অশিক্ষিত বেকার বামুনের ছেলেমেয়ে থাকলেও তারা কেউ কক্ষনো এই কাজের জন্য অ্যাপ্লাই করে না। বামুনের ছেলে হয়ে দেবুদা মাথায় করে মাছ ফেরি করে বেড়াত বলে পাড়ায় ঘোর বদনাম হয়েছিল।
৩
বাবার মুখে শুনেছি বাবা যখন ছোট ছিল খুবই কিউট বাচ্চা ছিল আর এ ও সে এসে চটকে দিত, বিস্কুট লজেন্স দিত। একটা বুড়ো লোক ছিল যাকে আমার বাচ্চা বাবা নাম ধরে ডাকত আর সে আমার বাবার দেখা পেলেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করত। বামুনের ছেলেকে প্রণাম করলে পুণ্যি হয়।
৪
আমার এক কাকা আক্ষেপ করে একদিন বলেছিল, সমস্ত রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের নাম আজকাল সোনার চাঁদ সোনার টুকরো। হ্যাঁ সে ট্রেনে যেতে যেতে নজর রাখে স্টেশন মাস্টারের নামফলকের দিকে - পদবী দেখবে বলে।
আশা করছি এতসব স্বীকারোক্তির পরে আমাকে কেউ আর বর্ণহিন্দু বলে গাল পাড়বেন না। পাড়লেও ভারি বয়ে গেছে। কয়েকমাস পরেই আমার তুতো দিদির ছেলের পইতে। তখন কবজি ডুবিয়ে খাব। আর ব্রহ্মচারী দন্ডিঘরে থাকাকালীন তার চোখ যেন কোনও অব্রাহ্মণের দিকে না যায় সেই ব্যবস্থা করব। জয় গুরু!
দলিত-নিগ্রহ বা 'নিচু' জাতের লোকজনকে অহেতুক হ্যাটা করার দৃশ্য আমি সত্যিই কোনদিন দেখিনি। দেখবই বা কিকরে? আমার আত্মীয়স্বজন-এর যাদের বেছে নেবার কোনও অপশন আমার কাছে ছিল না, প্রত্যেকের পদবী মোটামুটি - ব্যানার্জী, মুখার্জি, ব্যানার্জী, ব্যানার্জী, মুখার্জি, ভট্টাচার্য, রায়, গোস্বামী, বসু...পেয়েছি পেয়েছি একজন বসু আছে। হ্যাঁ আমার এক মাসতুত দিদির বরের পদবী বসু। নামের শেষে বসু আছে এমন একজনকে মেয়ে বিয়ে করবে মনস্থ করেছে শুনেই মাসি শয্যা নিয়েছিলেন। বহুদিন কেন্দ্রীয় সরকারে কর্মরত কায়স্থ জামাইয়ের মুখদর্শন করেননি। জীবনের শেষ দশ বছর অবশ্য দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁকে এই বসু পরিবারের সঙ্গেই এক বাড়িতে কাটাতে হয়। সে যাকগে যাক। এবারে আসা যাক আমার বন্ধু তালিকায়। অর্থাৎ যাদের আমি যেচে আমার জীবনের অংশ করেছি। তাদের পদবীগুলো মোটামুটি এইরকম - ব্যানার্জী, চক্রবর্তি, ভট্টাচার্য, পাল, গুহ, দত্ত, দাশগুপ্ত, নাথ, মুখার্জি, অধিকারী, বিশ্বাস, বসু, রায়চৌধুরী, ব্যানার্জী, গাঙ্গুলি, মন্ডল, মিত্র, কর্মকার, সরকার, আগরওয়াল, পান্ডে, নারায়ানন, বাগ, লাহিড়ি, চৌধুরী, রায়, চ্যাটার্জি। হ্যাঁ এক দু পিস বাদে সবই সৎ ব্রাহ্মণ। নিদেনপক্ষে কায়েত। আমি বেছে বেছে বর্ণহিন্দুদের সঙ্গেই দোস্তি পাতিয়েছি এমনটা ভাবতে প্রথমটায় খুব আত্মগ্লানি বোধ হলো। তারপর সেটা খন্ডাতে একটা অকাট্য যুক্তি বের করলাম। এই যে সব বন্ধুবান্ধবের দল, এদের আমি পেলাম কোথায়? কাউকে স্কুলে, কাউকে কলেজে, কাউকে ইউনিভার্সিটিতে, কাউকে অফিসে, কাউকে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। এই মোটের ওপর বন্ধু কালেকশনের ঠেক। এবারে বন্ধুত্ব পাতাতে গেলে তো আর আমি পদবী দেখে পাতাইনি? পালকের রঙ দেখে পাতিয়েছি। এখন এইসব জায়গায় যে আমি বেশি বেশি করে 'নিচু' জাতের মানুষ খুঁজে পাইনি, বা বলা ভালো প্রায় সবই বর্ণহিন্দু পেয়েছি তার দায় কি আমার, না আমার পূর্বপুরুষের না বেদের না সংবিধানের শুনি?
২
লক্ষ্মী'র পদবী আমি জানিনা। লক্ষ্মী বিহারি। পৌরসভার ঝাড়ুদারনি। সপ্তাহে একদিন ফ্রি ল্যান্স আমার বাড়ির দুটো বাথরুম আর ড্রেন পরিষ্কার করে দিয়ে যায় সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে। এছাড়া রোজ আমার বাড়িতে ওর কাজের ব্যাগটা রেখে যায়। ডিউটি শেষ করে ফেরার সময় তুলে নিয়ে যায়। লক্ষ্মী আমার মা কে 'মা' আর আমাকে আমার ডাকনাম ধরে ডাকে। আমি দরজা খুলে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত কায়দায় টুক করে 'ও যেন আমাকে টাচ না করে' স্টাইলে ভেতরে ঢুকে যায়। আর মাসের শেষে টাকা নেবার সময় দু হাত জড়ো করে আঁজলা পেতে দাঁড়ায়। আমি কিন্তু ওকে এসব করতে শেখাইনি। শুনেছি পৌরসভার কর্মী হবার সুবাদে ওরা এখন খুব খারাপ মাইনেকড়ি পায় না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যপার, অঞ্চলে বহু অশিক্ষিত বেকার বামুনের ছেলেমেয়ে থাকলেও তারা কেউ কক্ষনো এই কাজের জন্য অ্যাপ্লাই করে না। বামুনের ছেলে হয়ে দেবুদা মাথায় করে মাছ ফেরি করে বেড়াত বলে পাড়ায় ঘোর বদনাম হয়েছিল।
৩
বাবার মুখে শুনেছি বাবা যখন ছোট ছিল খুবই কিউট বাচ্চা ছিল আর এ ও সে এসে চটকে দিত, বিস্কুট লজেন্স দিত। একটা বুড়ো লোক ছিল যাকে আমার বাচ্চা বাবা নাম ধরে ডাকত আর সে আমার বাবার দেখা পেলেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করত। বামুনের ছেলেকে প্রণাম করলে পুণ্যি হয়।
৪
আমার এক কাকা আক্ষেপ করে একদিন বলেছিল, সমস্ত রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টারের নাম আজকাল সোনার চাঁদ সোনার টুকরো। হ্যাঁ সে ট্রেনে যেতে যেতে নজর রাখে স্টেশন মাস্টারের নামফলকের দিকে - পদবী দেখবে বলে।
আশা করছি এতসব স্বীকারোক্তির পরে আমাকে কেউ আর বর্ণহিন্দু বলে গাল পাড়বেন না। পাড়লেও ভারি বয়ে গেছে। কয়েকমাস পরেই আমার তুতো দিদির ছেলের পইতে। তখন কবজি ডুবিয়ে খাব। আর ব্রহ্মচারী দন্ডিঘরে থাকাকালীন তার চোখ যেন কোনও অব্রাহ্মণের দিকে না যায় সেই ব্যবস্থা করব। জয় গুরু!
Thursday, December 31, 2015
শব্দকোষ
রোজ সকালে বাড়ির উঠোনে একটা নিচু পিঁড়িতে বসে বড় জেঠিমা কুলোয় করে চাল ঝাড়ত। চালের একটা পড়ত কুলো থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে উঠে আবার নেমে আসত ঝিপ ঝিপ শব্দের তালে তালে। চাল থেকে বেছে রাখা খুদকুঁড়ো জমা করে রাখা হত একটা পুরনো দালদার টিনে। জেঠু মুঠো ভরে সেগুলো ছন ছন করে রকে ছড়িয়ে দিতেই ঝটাপট হুম হুম বক বক বকম বকম শব্দ তুলে গোলা লোটন গেরোবাজের দল রান্নাঘরের টালির চাল থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে কংক্রিটে টুক টুক করে ঠোঁট ঠুকে ঠুকে নিমেষে সাবড়ে দিত সব। মার্ফি রেডিওটা খড়বড় খড়বড় করে উঠে বলত 'বিবর্তনের পথে মানুষ'...। বাগানে দুটো ইঁটের ফাঁকে শুকনো ডালপাতা সাজিয়ে ফস করে দেশলাই জ্বেলে ঠাকুমা এক হাঁড়ি চানের জল চাপিয়ে বসে থাকত একটু দূরে। চটপটমড়মড় করে জ্বলে ওঠার খানিক পরেই এলুমিনিয়াম হাঁড়ির জল টগবগটগটব করে ফুটে উঠে উথলে গিয়ে ফ্যাঁসসস করে আগুন নিভিয়ে দিত। ছোটকাকা অ্যাল্লল্লল্লল্লল্ল গ্লল্লল্লল্ল গ্লাগগ্লাগগ্লাগ পুচুক করে সাড়া বাড়ি জানিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলত উঠোনের কলে। দাদুর খুরপি খুপ খুপ করে গাছের তলার মাটি আলগা করত। ঠুং করে জানান দিত মাটিতে মিশে থাকা ইঁটের টুকরোর খবর। উপুড় করে রাখা স্টীলের গ্লাসটা তুলে কুঁজোর গলার কাছটা ধরে নামিয়ে আনতেই বগবগবগবগ শব্দে জল বেরিয়ে এসে ভরিয়ে দিত গ্লাসের ফাঁদ। পাথরে নরুন ঘষার শব্দ ছিল। ছোট পেতলের হামানদিস্তায় পান ছাঁচার শব্দ ছিল। জাঁতিতে সুপুরি কাটার শব্দও...
যেসব শব্দেরা ছোটবেলা ঘিরে ছিল তাদের অনেকগুলোই আজ আর নেই।
নতুন শব্দেরা এক এক করে জীবনে জায়গা করে নিয়েছে। শিলনোড়ার শব্দের বদলে মিক্সির শব্দ, খাতায় পেন ঘষার শব্দের বদলে কীবোর্ড টেপার শব্দ। গ্র্যান্ডফাদারের ঢং ঢং থেকে অজন্তা ঘড়ির টুংটাং। ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং থেকে পলিফোনিক থেকে এমপিথ্রি। এই ঘুর্ণায়মান শব্দটানেলের ভেতর দিয়ে যতই এগিয়ে চলেছি পেছনে একের পর এক দরজার নিঃশব্দ বন্ধ হওয়া টের পেতে পেতে, মস্তিষ্কের ক্রমবর্ধমান ভার স্মৃতির পায়রাখোপে ঠুসে দিতে থাকে দৈনন্দিনতার সাদামাটা মূর্ছনা।
রাতের হুল্লোড়ঘোর কাটিয়ে নতুন বছরের সকালে চোখ খোলার আগেই পাশের বাড়ির ঝপাস জল ঢেলে খ্যাংরা কাঠির ঝাঁটার খর খর ছপাস খর খর ছপাস শুনলেই বুঝব, মাংসের ভেতরে লাব ডুব লাব ডুব ছন্দে বয়ে চলা রক্ত, ক্যালেন্ডারকে থোড়াই কেয়ার করে।
যেসব শব্দেরা ছোটবেলা ঘিরে ছিল তাদের অনেকগুলোই আজ আর নেই।
নতুন শব্দেরা এক এক করে জীবনে জায়গা করে নিয়েছে। শিলনোড়ার শব্দের বদলে মিক্সির শব্দ, খাতায় পেন ঘষার শব্দের বদলে কীবোর্ড টেপার শব্দ। গ্র্যান্ডফাদারের ঢং ঢং থেকে অজন্তা ঘড়ির টুংটাং। ক্রিরিরিং ক্রিরিরিং থেকে পলিফোনিক থেকে এমপিথ্রি। এই ঘুর্ণায়মান শব্দটানেলের ভেতর দিয়ে যতই এগিয়ে চলেছি পেছনে একের পর এক দরজার নিঃশব্দ বন্ধ হওয়া টের পেতে পেতে, মস্তিষ্কের ক্রমবর্ধমান ভার স্মৃতির পায়রাখোপে ঠুসে দিতে থাকে দৈনন্দিনতার সাদামাটা মূর্ছনা।
রাতের হুল্লোড়ঘোর কাটিয়ে নতুন বছরের সকালে চোখ খোলার আগেই পাশের বাড়ির ঝপাস জল ঢেলে খ্যাংরা কাঠির ঝাঁটার খর খর ছপাস খর খর ছপাস শুনলেই বুঝব, মাংসের ভেতরে লাব ডুব লাব ডুব ছন্দে বয়ে চলা রক্ত, ক্যালেন্ডারকে থোড়াই কেয়ার করে।
Monday, December 21, 2015
কৃষ্ণকলি? হাউ সিলি...
সেই কোন ছোটবেলায় কাকিমার তুতো ভাইয়ের ফর্সা ছেলে আমাকে দায়িত্ব নিয়ে বলেছিল 'তুই এত কালো কেন? রোজ সাবান মাখিস না? আমাকে দ্যাখ আমি রোজ সাবান মাখি তাই এত ফর্সা।' সেইদিন থেকে বলছি ফাদার মাদার গড প্রমিস, আমি রোজ গরমকালে দুবেলা আর শীতে একবেলা করে নিয়ম করে সাবান মেখে আসছি যদি রঙটা এখটু খোলতাই হয় সেই আশায়। তবে এই গরীবের আশায় সমস্ত সাবান কোম্পানিই এক এক করে ছাই দিয়েছে। সেই দুঃখে কখনো আমার ফর্সা টুকটুকে কাকিমার মেয়ে হয়ে যাব ভেবেছি, আপেল খেলে রাজীব গান্ধীর মতো গোলাপি গাল হবে, মায়ের এই গুল বেবাক হজম করে যখনই আপেল দিয়েছে তখনই খেয়ে নিয়েছি। কাঁচা হলুদ বাটা আর সর মেখে সঙ সেজে বসে থেকেছি ফি রোববার। খোদাতালার দেওয়া রঙ এমনই পাকা, যে কোনকিছুতেই বিন্দুমাত্র টসকায়নি।
তারপর একদিন ক্লাস ফাইভ নাগাদ একসঙ্গে অনেক কিছু জানতে পারলাম। কন্ট্যাক্ট লেন্স কাকে বলে জানলাম, তা দিয়ে যে চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেলা যায় জানলাম, আর স্রেফ চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেললেই উত্তম ছদ্মবেশ ধরা যায় তাও। সেইসঙ্গে জানলাম নায়িকার রঙও আমার গায়ের মতোই কালো হতে পারে (নায়িকা হবার দুঃসাধ্য সাধ অবশ্য তাতেও জাগেনি থ্যাঙ্কফুলি) আর এও জানলাম যে কটা চোখের কালো নায়িকাকে নিয়ে গান লেখা যেতে পারে ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল...
তারপর একে একে অনেক কিছু জানতে লাগলাম। নাওমি ক্যাম্পবেল চিনলাম, নয়নিকা চ্যাটার্জি চিনলাম, ছায়াসূর্য দেখলাম, কৃষ্ণকলি শুনলাম, আর প্রেমে পড়্রতে, চুমু খেতে, টিউবলাইটের ফ্যাটফ্যাটে আলোর নীচেও উদ্দাম হতে যে গায়ের রঙের বিশেষ ভূমিকা থাকে না, ক্রমে ক্রমে জেনে গেলাম এর সবটুকুই। তারপরে শুনলাম কবে নাকি কোন কবি কাকে বলেছিলেন তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা ইত্যাদি প্রভৃতি। সব মিলিয়ে কনফিডেন্সে হেব্বি তোল্লাই।
তারপর কৃষ্ণকলির বয়স বেড়েছে ঢের। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফ্যাশনজ্ঞান। কৃষ্ণকলির নায়ক ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসামের ব্র্যান্ড আম্বাস্যাডার হয়েছে।
আর কৃষ্ণকলি? ওমা! সে কই! সে তো আর নাই!!! তার গলা মুখ মেমসাহেবের মতো সাদা, গালে রাজীব গান্ধীর মতো গোলাপি আভা, ঠোঁট টকটকে লাল, আর তার আঁচল উড়ে উড়ে আকাশবাতাস ছেয়ে বিশ্বসংসারের সমস্ত কালো মেয়ের কনফিডেন্স নিয়ে গেন্ডুয়া খেলছে।
গেন্ডুয়া গেন্ডুয়া...উচ্চারণভেদে গেরুয়া গেরুয়া।
তারপর একদিন ক্লাস ফাইভ নাগাদ একসঙ্গে অনেক কিছু জানতে পারলাম। কন্ট্যাক্ট লেন্স কাকে বলে জানলাম, তা দিয়ে যে চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেলা যায় জানলাম, আর স্রেফ চোখের মণির রঙ পাল্টে ফেললেই উত্তম ছদ্মবেশ ধরা যায় তাও। সেইসঙ্গে জানলাম নায়িকার রঙও আমার গায়ের মতোই কালো হতে পারে (নায়িকা হবার দুঃসাধ্য সাধ অবশ্য তাতেও জাগেনি থ্যাঙ্কফুলি) আর এও জানলাম যে কটা চোখের কালো নায়িকাকে নিয়ে গান লেখা যেতে পারে ইয়ে কালি কালি আঁখে, ইয়ে গোরে গোরে গাল...
তারপর একে একে অনেক কিছু জানতে লাগলাম। নাওমি ক্যাম্পবেল চিনলাম, নয়নিকা চ্যাটার্জি চিনলাম, ছায়াসূর্য দেখলাম, কৃষ্ণকলি শুনলাম, আর প্রেমে পড়্রতে, চুমু খেতে, টিউবলাইটের ফ্যাটফ্যাটে আলোর নীচেও উদ্দাম হতে যে গায়ের রঙের বিশেষ ভূমিকা থাকে না, ক্রমে ক্রমে জেনে গেলাম এর সবটুকুই। তারপরে শুনলাম কবে নাকি কোন কবি কাকে বলেছিলেন তন্বী শ্যামা শিখরি-দশনা ইত্যাদি প্রভৃতি। সব মিলিয়ে কনফিডেন্সে হেব্বি তোল্লাই।
তারপর কৃষ্ণকলির বয়স বেড়েছে ঢের। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ফ্যাশনজ্ঞান। কৃষ্ণকলির নায়ক ফেয়ার এন্ড হ্যান্ডসামের ব্র্যান্ড আম্বাস্যাডার হয়েছে।
আর কৃষ্ণকলি? ওমা! সে কই! সে তো আর নাই!!! তার গলা মুখ মেমসাহেবের মতো সাদা, গালে রাজীব গান্ধীর মতো গোলাপি আভা, ঠোঁট টকটকে লাল, আর তার আঁচল উড়ে উড়ে আকাশবাতাস ছেয়ে বিশ্বসংসারের সমস্ত কালো মেয়ের কনফিডেন্স নিয়ে গেন্ডুয়া খেলছে।
গেন্ডুয়া গেন্ডুয়া...উচ্চারণভেদে গেরুয়া গেরুয়া।
Monday, December 14, 2015
ঘোর কলি
তারপর সেদিন তো খিদেয় যাকে বলে পেট দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে। তাও আবার যেমন তেমন খিদে নয়। বাংলা মাংস-ভাতের খিদে। খুব স্পেসিফিক চাহিদা। এদিকে ঘড়িতে দুপুর বেজেছে; হাতের কাজটুকুও শেষ; ডিসেম্বরের টলটলে দুপুর আস্তে ধীরে গড়িয়ে নামছে। নিউ মার্কেটের দিক থেকে গ্লবের গলিতে ঢুকে বাঁয়ে ঘুরে, ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে পড়ে, রাস্তা টপকে, ফায়ার ব্রিগেড ক্রস করে, পরের মোড়ে বাঁ দিকে ঘুরতেই কস্তূরী। না না আসলে হিংলাজ। যোজন ক্রোশ মরুভূমি পেরিয়ে আসা তীর্থযাত্রির মতোই হুড়মুড়িয়ে দৌড় দিলাম দোতলার দিকে। বাইরের বেসিনে হাত ধুয়ে কাচের দরজা ঠেলে ঢুকতেই একরাশ আমিষ গন্ধ এসে ডাইভ মারল নাকের ফুটো লক্ষ্য করে। একগাদা লোক তখন টেবিলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হাসিমুখের বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল - "কজন?"
ডান তর্জনীখানা তুলে বুঝিয়ে দিলাম যে ন্যাকা হলেও আসলে আমি একা। ব্যস!
বেচারার বাদামের খোসারং মুখের মধ্যে সাদা চোখ দুটো গোল হয়ে উঠে ভুরু অবধি পৌঁছে আবার প্রশ্ন 'একা!?' আবার মাথাখানা সামনে পেছনে নাড়িয়ে জানালাম হ্যাঁ। অবশেষে সে ঘুরে গিয়ে একটা টেবিল দেখিয়ে দিল। বুঝলাম, বেচারা জানেই না, মহিলারাও নিজে নিজে স্রেফ একা একা খেতে পারে কারুর সাহায্য না নিয়েই। বড় মায়া হলো। ঠিক করলাম বেচারাকে নিরাশ করব না।
ছোট স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাটির একবাটি ঝাল ঝাল শুকনো শুকনো চিকেন ভরতা আর নৌকোর মতো স্টীলের বাটির একবাটি ঝোল ঝোল খাসির মাংস উইথ দামড়া আলু মেখে একথালা ফুলকো ফুলকো ভাত হুশ করে উড়িয়ে দিলাম। শেষের অংশটায় একটু গন্ধ লেবুর রস মেখে নিয়েছিলাম। তারপর চাটনি। কিন্তু আমের চাটনি না থাকায় সে প্ল্যান ক্যানসেল করে দিয়ে প্লেটে জরুরি অবতরণ ঘটিয়ে বসল একবাটি রসমালাই। মরে যাওয়া দুধের লালচে ক্ষীরের মধ্যে নরম তুলতুলে প্রায় ভালনারেবল দুখানা রসগোল্লা, যার এক টুকরো চামচে কেটে একটু ক্ষীর সমেত মুখে তুললেই ওই গোবর্ধন বেয়ারাকে পজ্জন্ত ক্ষমা করে ফেলা যায়।
সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যতটা সম্ভব গন্ধ হাত থেকে দূর করার চেষ্টা করে বিফল হয়ে কাউন্টারে ফিরে এসে মিছরি দেওয়া মৌরি চিবুতে চিবুতে দুখানা টুথপিক পকেটস্থ করে, সেই আশ্চয্য কাজটা করে ফেললাম। ব্যাগ থেকে পারস বের করে পয়সা দিয়ে ফেললাম।
কী আশ্চয্যের ব্যপার বলুন তো! মেয়েমানুষ, নিজে হাতে করে একা একা ভালোমন্দ গিলে পকেট থেকে পয়সা বের করে দাম চুকিয়ে বেরিয়ে গেল! কোনও লোকাল গার্জেনের তত্ত্বাবধান ছাড়াই! এও হয়! ঘোর কলি...
ডান তর্জনীখানা তুলে বুঝিয়ে দিলাম যে ন্যাকা হলেও আসলে আমি একা। ব্যস!
বেচারার বাদামের খোসারং মুখের মধ্যে সাদা চোখ দুটো গোল হয়ে উঠে ভুরু অবধি পৌঁছে আবার প্রশ্ন 'একা!?' আবার মাথাখানা সামনে পেছনে নাড়িয়ে জানালাম হ্যাঁ। অবশেষে সে ঘুরে গিয়ে একটা টেবিল দেখিয়ে দিল। বুঝলাম, বেচারা জানেই না, মহিলারাও নিজে নিজে স্রেফ একা একা খেতে পারে কারুর সাহায্য না নিয়েই। বড় মায়া হলো। ঠিক করলাম বেচারাকে নিরাশ করব না।
ছোট স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বাটির একবাটি ঝাল ঝাল শুকনো শুকনো চিকেন ভরতা আর নৌকোর মতো স্টীলের বাটির একবাটি ঝোল ঝোল খাসির মাংস উইথ দামড়া আলু মেখে একথালা ফুলকো ফুলকো ভাত হুশ করে উড়িয়ে দিলাম। শেষের অংশটায় একটু গন্ধ লেবুর রস মেখে নিয়েছিলাম। তারপর চাটনি। কিন্তু আমের চাটনি না থাকায় সে প্ল্যান ক্যানসেল করে দিয়ে প্লেটে জরুরি অবতরণ ঘটিয়ে বসল একবাটি রসমালাই। মরে যাওয়া দুধের লালচে ক্ষীরের মধ্যে নরম তুলতুলে প্রায় ভালনারেবল দুখানা রসগোল্লা, যার এক টুকরো চামচে কেটে একটু ক্ষীর সমেত মুখে তুললেই ওই গোবর্ধন বেয়ারাকে পজ্জন্ত ক্ষমা করে ফেলা যায়।
সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে যতটা সম্ভব গন্ধ হাত থেকে দূর করার চেষ্টা করে বিফল হয়ে কাউন্টারে ফিরে এসে মিছরি দেওয়া মৌরি চিবুতে চিবুতে দুখানা টুথপিক পকেটস্থ করে, সেই আশ্চয্য কাজটা করে ফেললাম। ব্যাগ থেকে পারস বের করে পয়সা দিয়ে ফেললাম।
কী আশ্চয্যের ব্যপার বলুন তো! মেয়েমানুষ, নিজে হাতে করে একা একা ভালোমন্দ গিলে পকেট থেকে পয়সা বের করে দাম চুকিয়ে বেরিয়ে গেল! কোনও লোকাল গার্জেনের তত্ত্বাবধান ছাড়াই! এও হয়! ঘোর কলি...
Thursday, November 26, 2015
স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী
রবীন্দ্রনাথ, লেনিন, বাবা-মা আর নারীর যৌনাঙ্গ নেই। মানে আছে, কিন্তু থাকতে নেই। মানে থাকতে আছে, কিন্তু তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা চলে না। এঁদের যৌনজীবন, পছন্দ অপছন্দ, অভ্যেস, চয়েস কোনকিছু নিয়েই না। এর মধ্য়ে আবার মহিলাদের ব্যপারটা আরেক ধাপ এগিয়ে। কোনভাবে যদি এমন খবর পাওয়া যায় যে অমুক মহিলা তমুক লোকটার সঙ্গে থাকবে বলে নিজের বর-কে ছেড়ে চলে এসেছে, সংস্কারী জনতা তার শাপশাপান্ত বাপবাপান্ত করে সোশ্যাল মিডিয়া নামক চন্ডিমন্ডপে একে অপরের গা টিপে, চোখ মেরে রসালো জোক ছড়িয়ে দিয়ে বলবে - উফফ কী জিনিস! ওর খিদে মেটানো কি আর অমুকের কম্ম রে?
তার ওপর যদি দেখা যায় সেই মহিলা দু পয়সা কামিয়েছে এবং তালেবর হনুদের কম্যান্ড করে বেড়াচ্ছে জ্বলুনি আরও বেড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় শোনা যেতে থাকে - আরে এইসব মহিলাদের চিনতে কারুর বাকি নেই। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যার তার বিছানা গরম করতে এদের বিবেকে বাধে না।
বিবেক মানুষটা আবার খুব ফ্লেক্সিবল। কখনো বাবল গামের মতোন ফুলে ওঠে আবার কখনো লাথ খাওয়া কেন্নোর মতো কুঁকড়ে গর্তে সেঁধোয়। সুনন্দা পুষ্কর রহস্যজনকভাবে মারা যাবার পর বিবেক বোধকরি জুড়িগাড়ি চেপে হাওয়া খেতে বেরোয়। যে বিবেক 'দেখেছ কান্ড! নষ্ট মেয়েছেলেটা শশি থারুরের মতো সুপাত্রকে পাকড়েছে? নাহয় কটা বিয়েই করেছে। তাতে কী? হীরের আংটি আবার বেঁকা! তাছাড়া পুরুষমানুষের অমন একটু আধটু দোষ থাকেই। আহা কী সুন্দর ইংরিজি বলে, কেমন ফর্সা রং...আহা! ওই মেয়ছেলের আছে টা কী?' বলে হাঁক পেড়েছিল, সে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়।
ইন্দ্রাণী মুখুজ্জ্যের বিছানার রোল কল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দেশভক্ত জনতা ভুলে যায়, সংবিধান বলেছে, বিচারাধীন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ - innocent until proven guilty। আসলে অপরাধ নিয়ে তো তাদের মাথাব্যথা নেই। অপরাধী শনাক্ত হওয়া কিম্বা শাস্তি পাওয়ার ব্যপারটাও গৌণ। প্রাণভরে স্লাট শেমিং করা গেলে আর কী চাই? তাই, ইন্দ্রাণীর স্বামী গ্রেফতার হবার পর তারা বলেই ফেলে 'বাবা কী মেয়ে দেখেছ! সকলকে নাচিয়ে ছেড়েছে।'
এ কথা মানুষমাত্রেই জানে, যে স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী। স্ত্রী'র কথা শুনে চলে যে পুরুষ তাকে বলা হয় স্ত্রৈণ। স্বামীর কথা শুনে চলা/অনুগত স্ত্রী-এর জন্য অবশ্য এমন কোনও শব্দ অভিধানে নেই। কারণ স্পষ্ট। স্ত্রী স্বামীর কথা শুনবে এতে আবার অস্বাভাবিক কী আছে? এমনটাই তো হওয়ার কথা! তাও যদি চুপিচুপি ঘরের দোর দিয়ে বৌ-এর কথা শোনো মেনে নেওয়া যায়। প্রকাশ্যে স্ত্রী-এর উল্লেখমাত্র করলেও বাজারে জল্পনা শুরু হয়ে যায়, রাতে ওদের পছন্দের পজিশন নির্ঘাত ওম্যান অন টপ।
আমির খান মহাশয়ের বক্তব্যের পরেও আরেকবার তাই হলো। কিরণ রাও দেশে 'সেফ' বোধ না করলে যে দেশের অনেকানেক বীরপুঙ্গব তাঁকে সেই 'সেফটি' দিতে ইচ্ছুক এমন শোনা যায়। আমিরের চেয়ে কম বয়সী সঙ্গি বেছে নিতে পারলে নাকি তাঁর এমনটা মনে হতো না, কারণ এ কথা আমরা সকলেই জানি যে স্বামীর কাজই হলো স্ত্রী'র রক্ষাকর্তা হওয়া। যেখানে সানি লিওনির মতো গরম গণ-ভোগ্যা মহিলা এদেশে 'সেফ' কিরণ রাও-এর মতো 'সাধারণ' চেহারার মহিলা এদেশে কেন নিশ্চিন্ত বোধ করছেন না সেই নিয়েও প্রশ্ন শুনি। কিরণের ছোট চুল, ছোট বুক যে এদেশে কোনও পুং বিশ্বামিত্রকে টলাতে পারবে না, বুঝতে পারি।
শুধু মাঝেসাঝে, খুউউউউব মাঝেসাঝে (যেমন গত মাসে হলো দিল্লীতে) কিছু পুরুষের হাতে দুই-পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়ার সুযোগ পাই। ওদের একঢাল চুল, বিভঙ্গের ঢেউ, সুডৌল বুক, এসব ছিল?
তার ওপর যদি দেখা যায় সেই মহিলা দু পয়সা কামিয়েছে এবং তালেবর হনুদের কম্যান্ড করে বেড়াচ্ছে জ্বলুনি আরও বেড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় শোনা যেতে থাকে - আরে এইসব মহিলাদের চিনতে কারুর বাকি নেই। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যার তার বিছানা গরম করতে এদের বিবেকে বাধে না।
বিবেক মানুষটা আবার খুব ফ্লেক্সিবল। কখনো বাবল গামের মতোন ফুলে ওঠে আবার কখনো লাথ খাওয়া কেন্নোর মতো কুঁকড়ে গর্তে সেঁধোয়। সুনন্দা পুষ্কর রহস্যজনকভাবে মারা যাবার পর বিবেক বোধকরি জুড়িগাড়ি চেপে হাওয়া খেতে বেরোয়। যে বিবেক 'দেখেছ কান্ড! নষ্ট মেয়েছেলেটা শশি থারুরের মতো সুপাত্রকে পাকড়েছে? নাহয় কটা বিয়েই করেছে। তাতে কী? হীরের আংটি আবার বেঁকা! তাছাড়া পুরুষমানুষের অমন একটু আধটু দোষ থাকেই। আহা কী সুন্দর ইংরিজি বলে, কেমন ফর্সা রং...আহা! ওই মেয়ছেলের আছে টা কী?' বলে হাঁক পেড়েছিল, সে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়।
ইন্দ্রাণী মুখুজ্জ্যের বিছানার রোল কল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দেশভক্ত জনতা ভুলে যায়, সংবিধান বলেছে, বিচারাধীন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ - innocent until proven guilty। আসলে অপরাধ নিয়ে তো তাদের মাথাব্যথা নেই। অপরাধী শনাক্ত হওয়া কিম্বা শাস্তি পাওয়ার ব্যপারটাও গৌণ। প্রাণভরে স্লাট শেমিং করা গেলে আর কী চাই? তাই, ইন্দ্রাণীর স্বামী গ্রেফতার হবার পর তারা বলেই ফেলে 'বাবা কী মেয়ে দেখেছ! সকলকে নাচিয়ে ছেড়েছে।'
এ কথা মানুষমাত্রেই জানে, যে স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী। স্ত্রী'র কথা শুনে চলে যে পুরুষ তাকে বলা হয় স্ত্রৈণ। স্বামীর কথা শুনে চলা/অনুগত স্ত্রী-এর জন্য অবশ্য এমন কোনও শব্দ অভিধানে নেই। কারণ স্পষ্ট। স্ত্রী স্বামীর কথা শুনবে এতে আবার অস্বাভাবিক কী আছে? এমনটাই তো হওয়ার কথা! তাও যদি চুপিচুপি ঘরের দোর দিয়ে বৌ-এর কথা শোনো মেনে নেওয়া যায়। প্রকাশ্যে স্ত্রী-এর উল্লেখমাত্র করলেও বাজারে জল্পনা শুরু হয়ে যায়, রাতে ওদের পছন্দের পজিশন নির্ঘাত ওম্যান অন টপ।
আমির খান মহাশয়ের বক্তব্যের পরেও আরেকবার তাই হলো। কিরণ রাও দেশে 'সেফ' বোধ না করলে যে দেশের অনেকানেক বীরপুঙ্গব তাঁকে সেই 'সেফটি' দিতে ইচ্ছুক এমন শোনা যায়। আমিরের চেয়ে কম বয়সী সঙ্গি বেছে নিতে পারলে নাকি তাঁর এমনটা মনে হতো না, কারণ এ কথা আমরা সকলেই জানি যে স্বামীর কাজই হলো স্ত্রী'র রক্ষাকর্তা হওয়া। যেখানে সানি লিওনির মতো গরম গণ-ভোগ্যা মহিলা এদেশে 'সেফ' কিরণ রাও-এর মতো 'সাধারণ' চেহারার মহিলা এদেশে কেন নিশ্চিন্ত বোধ করছেন না সেই নিয়েও প্রশ্ন শুনি। কিরণের ছোট চুল, ছোট বুক যে এদেশে কোনও পুং বিশ্বামিত্রকে টলাতে পারবে না, বুঝতে পারি।
শুধু মাঝেসাঝে, খুউউউউব মাঝেসাঝে (যেমন গত মাসে হলো দিল্লীতে) কিছু পুরুষের হাতে দুই-পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়ার সুযোগ পাই। ওদের একঢাল চুল, বিভঙ্গের ঢেউ, সুডৌল বুক, এসব ছিল?
Wednesday, July 15, 2015
বাহুবলে বাজিমাত
বাহুবলির টিকিট মূল্য হিসেবে আইনক্স ২৯০/- টাকা লুটে নিল। পুঁজিবাদকে গালমন্দ করতে করতে হলে ঢুকলাম এবং ঢুকেই বুঝলাম, আসলে আইনক্সের বদলে সি এস লিউইস-এর নারনিয়ার সেই আলমারিতে ঢুকে পড়েছি যার ওপারের পৃথিবীতে গাছ-পাথর-জন্তু-অর্ধমানব-সিংহ কথা বলে, যুদ্ধ করে, রাজ্যশাসন করে। প্রায় তিনঘন্টার লম্বা সিনেমায় বিভিন্ন সময়ে নিজের হাতে চিমটি কেটে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে, মাছি ঢুকে যাবার মতো বড় হাঁ করে বসে থেকে জানতে পারলাম গল্প শেষ হইয়াও শেষ হইল না। কারণ বাকিটা ব্রেক কে বাদ - ২০১৬ এ রিলিজ। অগত্যা হিসেব কষতে বসলুম।
willing suspension of disbelief - PRICELESS
- ভায়াগ্রা জলপ্রপাত (নায়াগ্রার বাবা) - ১০০/- টাকা
- নায়কের প্রপাতারোহণ পতন ও পুনরায় আরোহণ- ৪০/- টাকা
- ফর্সা টুকটুকে পেলব কাঁচুলি পরিহিতা নায়িকা - ৩০/- টাকা
- ঝরনার আনাচেকানাচে উড়ন্ত প্রেমগান - ১৫/- টাকা
- ট্রপিক্যাল জঙ্গল - ৭.৫০/- টাকা
- গ্লেসিয়ার - ৭.৫০/- টাকা
- বরফ ধস - ১০/- টাকা
- টোবোগ্যাগিং করে বরফ ধস কাটানো - ৫/- টাকা
- সি জি আই শহর - ২৫/- টাকা
- যুদ্ধ - ৩৫/- টাকা
- কাগজের তৈরি নকল হাত - ৫/- টাকা
- মানুষ বনাম সি জি আই ষাঁড়ের চোখধাঁধানো লড়াই - ১০/- টাকা
willing suspension of disbelief - PRICELESS
Subscribe to:
Posts (Atom)