Thursday, November 26, 2015

স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী

রবীন্দ্রনাথ, লেনিন, বাবা-মা আর নারীর যৌনাঙ্গ নেই। মানে আছে, কিন্তু থাকতে নেই। মানে থাকতে আছে, কিন্তু তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা চলে না। এঁদের যৌনজীবন, পছন্দ অপছন্দ, অভ্যেস, চয়েস কোনকিছু নিয়েই না। এর মধ্য়ে আবার মহিলাদের ব্যপারটা আরেক ধাপ এগিয়ে। কোনভাবে যদি এমন খবর পাওয়া যায় যে অমুক মহিলা তমুক লোকটার সঙ্গে থাকবে বলে নিজের বর-কে ছেড়ে চলে এসেছে, সংস্কারী জনতা তার শাপশাপান্ত বাপবাপান্ত করে সোশ্যাল মিডিয়া নামক চন্ডিমন্ডপে একে অপরের গা টিপে, চোখ মেরে রসালো জোক ছড়িয়ে দিয়ে বলবে - উফফ কী জিনিস! ওর খিদে মেটানো কি আর অমুকের কম্ম রে?

তার ওপর যদি দেখা যায় সেই মহিলা দু পয়সা কামিয়েছে এবং তালেবর হনুদের কম্যান্ড করে বেড়াচ্ছে জ্বলুনি আরও বেড়ে যায়। পাড়ায় পাড়ায় শোনা যেতে থাকে - আরে এইসব মহিলাদের চিনতে কারুর বাকি নেই। নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে যার তার বিছানা গরম করতে এদের বিবেকে বাধে না।

বিবেক মানুষটা আবার খুব ফ্লেক্সিবল। কখনো বাবল গামের মতোন ফুলে ওঠে আবার কখনো লাথ খাওয়া কেন্নোর মতো কুঁকড়ে গর্তে সেঁধোয়। সুনন্দা পুষ্কর রহস্যজনকভাবে মারা যাবার পর বিবেক বোধকরি জুড়িগাড়ি চেপে হাওয়া খেতে বেরোয়। যে বিবেক 'দেখেছ কান্ড! নষ্ট মেয়েছেলেটা শশি থারুরের মতো সুপাত্রকে পাকড়েছে? নাহয় কটা বিয়েই করেছে। তাতে কী? হীরের আংটি আবার বেঁকা! তাছাড়া পুরুষমানুষের অমন একটু আধটু দোষ থাকেই। আহা কী সুন্দর ইংরিজি বলে, কেমন ফর্সা রং...আহা! ওই মেয়ছেলের আছে টা কী?' বলে হাঁক পেড়েছিল, সে বিস্ময়ে বাক্যহারা হয়।

ইন্দ্রাণী মুখুজ্জ্যের বিছানার রোল কল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে দেশভক্ত জনতা ভুলে যায়, সংবিধান বলেছে, বিচারাধীন ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ -  innocent until proven guilty। আসলে অপরাধ নিয়ে তো তাদের মাথাব্যথা নেই। অপরাধী শনাক্ত হওয়া কিম্বা শাস্তি পাওয়ার ব্যপারটাও গৌণ। প্রাণভরে স্লাট শেমিং করা গেলে আর কী চাই? তাই, ইন্দ্রাণীর স্বামী গ্রেফতার হবার পর তারা বলেই ফেলে 'বাবা কী মেয়ে দেখেছ! সকলকে নাচিয়ে ছেড়েছে।'

এ কথা মানুষমাত্রেই জানে, যে স্ত্রী-বুদ্ধি ভয়ঙ্করী। স্ত্রী'র কথা শুনে চলে যে পুরুষ তাকে বলা হয় স্ত্রৈণ। স্বামীর কথা শুনে চলা/অনুগত স্ত্রী-এর জন্য অবশ্য এমন কোনও শব্দ অভিধানে নেই। কারণ স্পষ্ট। স্ত্রী স্বামীর কথা শুনবে এতে আবার অস্বাভাবিক কী আছে? এমনটাই তো হওয়ার কথা! তাও যদি চুপিচুপি ঘরের দোর দিয়ে বৌ-এর কথা শোনো মেনে নেওয়া যায়। প্রকাশ্যে স্ত্রী-এর উল্লেখমাত্র করলেও বাজারে জল্পনা শুরু হয়ে যায়, রাতে ওদের পছন্দের পজিশন নির্ঘাত ওম্যান অন টপ।

আমির খান মহাশয়ের বক্তব্যের পরেও আরেকবার তাই হলো। কিরণ রাও দেশে 'সেফ' বোধ না করলে যে দেশের অনেকানেক বীরপুঙ্গব তাঁকে সেই 'সেফটি' দিতে ইচ্ছুক এমন শোনা যায়। আমিরের চেয়ে কম বয়সী সঙ্গি বেছে নিতে পারলে নাকি তাঁর এমনটা মনে হতো না, কারণ এ কথা আমরা সকলেই জানি যে স্বামীর কাজই হলো স্ত্রী'র রক্ষাকর্তা হওয়া। যেখানে সানি লিওনির মতো গরম গণ-ভোগ্যা মহিলা এদেশে 'সেফ' কিরণ রাও-এর মতো 'সাধারণ' চেহারার মহিলা এদেশে কেন নিশ্চিন্ত বোধ করছেন না সেই নিয়েও প্রশ্ন শুনি। কিরণের ছোট চুল, ছোট বুক যে এদেশে কোনও পুং বিশ্বামিত্রকে টলাতে পারবে না, বুঝতে পারি।

শুধু মাঝেসাঝে, খুউউউউব মাঝেসাঝে (যেমন গত মাসে হলো দিল্লীতে) কিছু পুরুষের হাতে দুই-পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ের ধর্ষণের খবর পড়ার সুযোগ পাই। ওদের একঢাল চুল, বিভঙ্গের ঢেউ, সুডৌল বুক, এসব ছিল?

Wednesday, July 15, 2015

বাহুবলে বাজিমাত

বাহুবলির টিকিট মূল্য হিসেবে আইনক্স ২৯০/- টাকা লুটে নিল। পুঁজিবাদকে গালমন্দ করতে করতে হলে ঢুকলাম এবং ঢুকেই বুঝলাম, আসলে আইনক্সের  বদলে সি এস লিউইস-এর নারনিয়ার সেই আলমারিতে ঢুকে পড়েছি যার ওপারের পৃথিবীতে গাছ-পাথর-জন্তু-অর্ধমানব-সিংহ কথা বলে, যুদ্ধ করে, রাজ্যশাসন করে।  প্রায় তিনঘন্টার  লম্বা সিনেমায়  বিভিন্ন সময়ে নিজের হাতে  চিমটি কেটে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে, মাছি ঢুকে যাবার মতো বড় হাঁ করে বসে থেকে  জানতে পারলাম গল্প শেষ হইয়াও শেষ হইল না। কারণ বাকিটা ব্রেক কে বাদ - ২০১৬ এ রিলিজ। অগত্যা হিসেব কষতে বসলুম।


  • ভায়াগ্রা জলপ্রপাত (নায়াগ্রার বাবা) - ১০০/- টাকা 
  • নায়কের প্রপাতারোহণ পতন ও পুনরায় আরোহণ- ৪০/- টাকা
  • ফর্সা টুকটুকে পেলব কাঁচুলি পরিহিতা নায়িকা - ৩০/- টাকা
  • ঝরনার আনাচেকানাচে উড়ন্ত প্রেমগান - ১৫/- টাকা
  • ট্রপিক্যাল জঙ্গল - ৭.৫০/- টাকা
  • গ্লেসিয়ার - ৭.৫০/- টাকা
  • বরফ ধস - ১০/- টাকা 
  • টোবোগ্যাগিং করে বরফ ধস কাটানো - ৫/- টাকা 
  • সি জি আই শহর - ২৫/- টাকা 
  • যুদ্ধ - ৩৫/- টাকা 
  • কাগজের তৈরি নকল হাত - ৫/- টাকা 
  • মানুষ বনাম সি জি আই ষাঁড়ের চোখধাঁধানো লড়াই - ১০/- টাকা 


willing suspension of disbelief - PRICELESS



Monday, June 29, 2015

আমেরিকার গর্ব আমার নয়

আমেরিকা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রগতিশীল দেশ, এমন ধারণা উপমহাদেশের কেউ কেউ সানন্দে পোষণ করেন। অথচ আমেরিকা সেই দেশ যাদের সিভিল রাইটস মুভমেন্টের পরে ভোট দিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে কেটে গেছে এতগুলো দশক। মহিলা রাষ্ট্রপতি তারা স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও নির্বাচন করতে পারেনি। আমেরিকা এমন একটা দেশ যেখানে মৃত্যুদণ্ড স্বমহিমায় বহাল। আমেরিকা সেই দেশ যেখানে সংসদে (কংগ্রেস) মহিলা সদস্য ১৮% মাত্র। সর্বশেষে, আমেরিকা পৃথিবীর তেইশতম দেশ যেখানে সমকামী বিয়েকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এর আগে আরো বাইশটা দেশ এই পদক্ষেপ নিয়েছে, আমেরিকাকে এই বিষয়ে পথিকৃত কোনমতেই বলা চলে না।

অথচ কী আশ্চর্য, ফেসবুকের রামধনু রঙের জোয়ার দেখলে মনে হচ্ছে আমেরিকা সমকামী বিয়ের স্বীকৃতি দেওয়ামাত্র পৃথিবীর সমস্ত সমকামী/এলজিবিটি মানুষের স্বাধিকারপ্রাপ্তি ঘটে গেছে। ফেসবুকের সেলিব্রেট প্রাইড অ্যাপটি আমাদের শেখাচ্ছে আমেরিকার গর্বে গর্ব করে কিভাবে প্রোফাইলের ছবিটা রামধনু রঙে ঢেকে ফেললেই প্রমাণ হবে আমি সমকামীদের সমব্যথি/সহমর্মী। কিভাবে আমেরিকার সমকামীদের সাথে একাত্মবোধ করতে না পারলে আমার আলোকপ্রাপ্তি অসম্পূর্ণ থাকবে। আমেরিকা যেন পৃথিবীর প্রতীক, আমেরিকার সাফল্যেই জগতের সাফল্য। গ্লোবাল সিটিজেন হয়ে উঠবার প্রথম ও সর্বপ্রয়োজনীয় ধাপ, আমেরিকার সাথে একাত্মবোধ করা।

রাষ্ট্রপতি ওবামাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন সাহসী পদক্ষেপ নিতে পারার জন্য। মার্ক জুকারবার্গকে অভিনন্দন নিজের দেশের আইনব্যবস্থা/সরকারের গর্বে ছাতি ফুলিয়ে ফেসবুকময় রামধনু রং ছড়ানোর জন্য। তবে এ প্রশ্ন না করে থাকা যাচ্ছে না, যদি সসাগরা পৃথিবীর সমকামীদের অধিকারের ব্যপারে ফেসবুক এতটাই সচেতন, তাহলে আয়ারল্যান্ডের মতো দেশ (যেখানে এখনও ভ্রুণহত্যা নিষিদ্ধ) সমকামীদের সমানাধিকারের স্বীকৃতি দিলে কেন তা নিয়ে কাউকে উচ্চবাচ্য তো দূর, মাথা ঘামাতেও দেখা যায় না!

গোটা ব্যপারটা আর তাতে উপমহাদেশের অত্যুৎসাহ দেখে মনে হচ্ছে চিনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান বলার পর এবার বলা হবে আমেরিকার গর্ব আমাদের গর্ব।

Thursday, June 25, 2015

রজঃস্বলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি...

অতঃপর পৃথিবী রজঃস্বলা হইলেন। মন্দিরদ্বার রুদ্ধ হইল। বিধবার অন্নব্যঞ্জন নিষিদ্ধ হইল। হলকর্ষণ মুলতুবি রইল। তথাপি একটি গূঢ় সমস্যার কোনরূপ সমাধান করিতে না পারিয়া ধর্মগুরুরা সভার আয়োজন করিয়া পরামর্শ করা স্থির করিলেন। সকল গুরুদ্বিগের প্রস্তাব শ্রবণ করিয়া মহাগুরু (ডান্স বাংলা ডান্সের সহিত ওঁর কোনও যোগাযোগ নাই) সিদ্ধান্তে উপনীত হইবেন, এমন প্রস্তাব লওয়া হইল। মহাগুরুর নাম জানিতে আমাদের কিয়ৎকাল প্রতিক্ষা করিতে হইবে।
সভাস্থলে গুরুরা সকলে একে একে নিজ নিজ প্রস্তাব রাখিতে লাগিলেন।
রক্ষী মহারাজ - ইহযাবতকাল ধরিয়া শুনিয়া মানিয়া ও বলিয়া আসিয়াছি, রজঃস্বলা নারি অশুচি, অপবিত্র। তাহাকে স্পর্শ করা অনৈতিক, অশুদ্ধ কর্ম হিসাবে চিহ্নিত হইবে। তথাপি, পৃথিবীর রজঃকালে আমরা কোন বিচারে ইহার পৃষ্ঠে কাল অতিবাহিত করিব? আমার প্রস্তাব, অম্বুবাচী চলাকালীন আমরা প্রত্যেকে বৃক্ষপৃষ্ঠে কাল অতিবাহিত করি। ক্ষুধা নিবারণের জন্য প্রয়োজনীয় ফলাহারের উপকরণ সাথে লইয়াই যাইব।
নবীন ধোকারিয়া - মহাগুরুদেব, ইয়ে অপরাধ নেবেন না। আমার স্যার সারা গায়ে বাত, এই বয়সে গাছে চড়তে গিয়ে প্রাণপাখিটি উড়ে গেলে অনেক সাধ আহ্লাদ অপূর্ণ থেকে যাবে। তার ওপর বৃষ্টি বাদল গরম এসব আজকাল আর সহ্য হয় না। আমি বরং আমার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লিমোতে থাকি? পৃথিবীর মাটিতে পাও দিতে হলো না, আবার পিঠও বাঁচল।
সাধ্বী কাঁচি - গুরুদেব, পৃথিবী, ধরিত্রী, আমাদের মাতা। মাতা কখনও অশুচি হতে পারে না গুরুদেব! মাতাকে অশুচি করে একদল বিধর্মী, বেজাতের মানুষ। আমার প্রস্তাব, এই রজোঃপর্বে, সকল বিধর্মীকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেওয়া হোক। তাহলেই ল্যাঠা চুকে যায়।
ঘষারাম বাপু - ধরিত্রীর অশুচিতা লইয়া পুরুষদিগের কোনরূপ সমস্যা দেখিতেছি না। ধরিত্রীর রজোপর্বে সকল পুরুষ ভিন্ন ভিন্ন মহিলার দেহে গমন করিলেই তাহারা অশুচিতা হইতে মুক্ত পাইবে এবং পুরুষদেহের ঈপ্সা পূর্ণ করিবার পুণ্যে উক্ত মহিলাগণও কোনরূপে কলুষিত হইবেন না।
এক্ষণে মহাগুরুদেব 'স্বামী চড়েন গদি' আপনার আসন হইতে পশ্চাদ্দেশ বিচ্ছিন্ন করিয়া দুই হস্ত সম্মুখে প্রসারিত করিলেন। সকল সভাসদগণ নিজ নিজ স্থানে দন্ডায়মান হইলে তিনি স্মিতহাস্য করিয়া বলিলেন, 'মিত্রোঁ, কতিপয় দিবস পূর্বে যে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের আয়োজন করাইলাম, তাহার হেতু তোমাদের হৃদয়ঙ্গম হয়নি দেখিতেছি। পাঁজি দেখিয়া বুঝিয়া শুনিয়াই তাহা করিয়াছিলাম। যোগাভ্যাসে আমরা জাতিগতভাবে বিশেষরূপে পটু। অতএব, অম্বুবাচীর পঞ্চ দিবস, যোগবলে ভূমিপৃষ্ঠ স্পর্শ না করিয়াই, শূন্যে ভাসমান হইয়া কাল অতিবাহিত করিব।  উক্ত স্টান্টের নামকরণ করিব - আসন শূন্য।

Wednesday, June 3, 2015

সূর্য বলল ইশ


সূর্যবাবুর বয়স হয়েছে। নিজেই বেশ বুঝতে পারছেন, এ ব্রহ্মাণ্ডে আর বেশিদিন নেই। অচিরেই একদিন ভুস করে নিভে যেতে হবে। আর তাই নেভার আগে দপদপিয়ে জ্বলে উঠেছেন। পাড়াময় তাণ্ডব করে বেড়াচ্ছেন। এর পুকুর শুকিয়ে দিচ্ছেন, ওর মাথা টলিয়ে দিচ্ছেন, ঘামে ঘামাচিতে একসা করে ছেড়ে দিচ্ছেন পাহাড়  জঙ্গল সমতল। এমন দিন এসেছে যে পাহাড়ও হাসি ভুলে কাঁচুমাচু মুখে চেয়ে আছে নীচের সবুজ দাবদাহের দিকে।

এদিকে এদ্দিন যারা অজান্তে সুর্যবাবুকে সাহায্য করে এসেছেন ফ্রিজ এসি চালিয়ে ওজোন স্তর ফুটো করে, তারা পড়েছেন মহা ফাঁপরে। উঁচু বাড়ির উঁচু ট্যাঙ্কের জল কল দিয়ে বেরনোমাত্রই হাতে ফোস্কা পড়ে যাচ্ছে। ওই জলে আলু ডিম সেদ্ধ করা কিম্বা ঠাকুমার হাঁটুতে সেঁক দেওয়া গেলেও, চান করার রিস্ক নেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ফ্যান্সি ঝাঁ চকচকে বাথরুমে সবেধন নীলমণি বালতিখানা ঝি ঘর মোছার কাজে ব্যবহার করে।  বালতি ফালতির মতো আনফ্যাশনেবল ব্যপার স্যপার  গিন্নীমা মোটেই পছন্দ করেন না, কাজেই বালতিতে জল ভরে চারঘন্টা পরে চান করার সম্ভাবনাও নেই। অগত্যা প্রায় কাকভোরে আজানের সময়ে উঠে চান সেরে নটার মধ্যে শীত এবং আতপ নিয়ন্ত্রিত আপিসে ঢুকে পড়াই একমত্র উপায়। উইকেন্ডেও গেম প্ল্যানের বিশেষ পরিবর্তন হচ্ছে না। সক্কাল সক্কাল সপরিবারে একটা মলে ঢুকে পড়তে হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে ভূমিকম্প যেকোনো বিষয়ের সিনেমা দেখে ফেলতে হবে। তারপর পান ভোজন এবং শেষে মলত্যাগ।

 অনেকেই এর মধ্যে কর্পোরেট চক্রান্ত দেখতে পাচ্ছেন। সূর্যবাবু এসি, কালো চশমা, কুলার কোম্পানির টাকা খেয়েই এমন কার্যকলাপ করছেন এমন অভিযোগ বিভিন্ন স্তরের মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে। এদিকে মানুষের ক্ষোভ জমতে জমতে আকাশ ছুঁয়েছে। তবে আকাশ ছুঁলেও সূর্যের নাগাল পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ফেসবুক নামক বিপ্লবের প্ল্যাটফর্মে 'বদলা নয় বাদল চাই' আন্দোলন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য একটা অনলাইন পিটিশন জমা দেওয়া। অংশগ্রহণ করতে গেলে সুর্যকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ফোরগ্রাউন্ডে নিজের ঘর্মাক্ত কলেবরের সেলফি তুলে পোস্ট করতে হচ্ছে। গোড়ায় অনেকে নিয়মাবলী খুঁটিয়ে না পড়ার কারণে জিম, বেডরুম ইত্যাদি নানা জায়গায় পরিশ্রমের ফলে ঘেমে যাওয়ার পর সেই ছবি তুলে পোস্ট করার ফলে আন্দোলনের হোতাদের লজ্জায় পড়তে হয়। বেশ কিছু ছবি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ব্যানও করে। জনরোষ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে শহরের একটি ওয়ার্ডে রক্তদান শিবিরে 'ভারতবর্ষ সুর্যের এক নাম' গান চালানোয় স্থানীয় লোকজন চড়াও হয়ে মাইক ভেঙে দেয়।   

সূর্যবাবুর মোটা চামড়ায় অবশ্য হেলদোলের লেশমাত্র নেই। নিজের উঁচু হাতির দাঁতের মিনারে রিমোট হাতে বসে অন্যান্য সৌরজগতের কর্তাব্যক্তিদের চালচলনের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে চলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সূর্যদা জানেন, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। আর যতদিন তেজ, ঠিক ততদিনই ফুটেজ।

Sunday, May 17, 2015

ছাদ

গ্রীষ্মের রাতের এই এক মজা। এক একটা হাওয়ার ঢেউ আসে, আর চারপাশের সুপুরি নারকোল গাছের পাতারা সরসর ঝরঝর খরখর শব্দে দলে দুলে মাথা ঝাঁকাতে থাকে। ঢেউ চলে গেলে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করে পরের ঢেউটার জন্য। কিন্তু লোহার সিঁড়ির রেলিং ধরে বেয়ে ওঠা বিলিতি ফুলের গাছের সেসব উত্তেজনার বালাই নেই। পায়ের তলায় অল্প মাটি। ওর রেলিং ধরে বাঁচা। তাই নির্লিপ্তি প্র্যাকটিস করছে। ঝড় বাদল কালবোশেখি শিলাবৃষ্টি দখিনা বাতাস সবেতেই তিরতির তিরিতির করে কাঁপে। সে কাঁপুনিতে উল্লাসও নেই, উত্তেজনাও নেই, উন্মাদনাও নেই। শুধু নিজের বাঁচটুকুতে কনসেন্ট্রেট করেছে। আর আমি রাতে ছাদের লোহার সিঁড়িতে বসে হাওয়া খাই। কয়েকধাপ নীচে সিমেন্টের মেঝেতে, আলসেয় বসে সাইকাস, বেল, জবা, গোলাপ, নয়নতারা, ফার্ন, লিলি, লাল ফুলওয়ালা ক্যাকটাসের ছোট, বড়, মাঝারি, চ্যাপ্টা, লম্বাটে, গোলাকার মাটির টব, চুপচাপ দাঁড়িয়ে ঘুমোয়, মাঝে উসখুস করে, থম মেরে ঘাড় গুঁজে হাইওয়ের ধুলোর মতো জমতে দেয় গায়ে অন্ধকার চিরে ছড়িয়ে পড়া উঁচু বাতিস্থম্ভের জোরালো সাদা আলো। দূরে দূরের কোনো ছাদে সিগারেটের লাল আগুন কমছে বাড়ছে, ঘোরাফেরা করছে স্মার্টফোনের আলো। কথা বলার, আগুন ছোঁয়ার বেয়াড়া অভ্যেসে রাত জাগছে পায়চারীর ছাদ।

হয়ে গেল চশমা



সঃ আজ বাজার খুব খারাপ।

অঃ কত গেল?

সঃ হাজার দেড়েক।

অঃ ও মেকআপ হয়ে যাবে। খেয়াল রাখিস লস যেন পাঁচ হাজার না ছাড়ায়।

যঃ কাল ছোট মাসি ফোন করেছিল। ছেলের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। ওর বিয়েতে কিন্তু ভালো কিছু দিতে হবে মনে রেখো। আমাদের মাইক্রোওয়েভ দিয়েছিল। অন্তত হাজার পাঁচেক বাজেট ধরে রাখো। আমিও কিছু দেব, চিন্তা কোরো না।

লঃ হুম।

যঃ কী হল?

লঃ কই কিছু না তো। শুনলাম।

যঃ ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই ওমনি শুনে নিলে? কী করো বলত সারাক্ষণ? কার সাথে এত কথা বলো? আমি কি কিছুই বুঝি না ভাবো?

লঃ যাহ বাবা! চোখ দিয়ে তো শুনি না। কান দিয়ে শুনি। যা বললে শুনে নিয়েছি। তোমার ছোট মাসির ছেলের বিয়ে। গিফটের বাজেট পাঁচ। শান্তি?

গঃ হ্যালো। কেমন আছিস?

ফঃ এই তো চলছে, বল।

গঃ শোন না, একটা দরকারে ফোন করলাম। মাইক্রোওয়েভে ভাপা ইলিশ করতে হলে কতক্ষণ সময় দেওয়া উচিৎ রে?

ফঃ পাঁচ মিনিট।

কঃ এই তোমার পাঁচ মিনিট? সবসময় এত ঢপ দাও কেন বলো দেখি? মোবাইল ফোনে কথা বলা মানেই ঢপ? এই নাকি তুমি অটো থেকে নামছ?

পঃ আরে! সত্যিই। লাস্ট মোমেন্টে সিগনাল খেয়ে গেলাম। নইলে পাঁচ মিনিটই লাগত। মাইরি বলছি। তোমার গা ছুঁয়ে বলছি।

কঃ আমার গা ছোঁয়ার জন্য আজকাল তোমাকে এসব ভুলভাল বাহানা দিতে হচ্ছে বুঝি?

রঃ একজন কাউকে ছুঁয়ে থাকতে হবে।

টঃ একটা ঠান্ডা দেহ, কে ছুঁয়ে থাকল কি থাকল না তাতে আর কার কিই বা যায় আসে বলত? শেষ তো সেই আগুন, সেই গঙ্গায়। এসব ফুল ধূপ আতরেরই বা কী দরকার!

রঃ আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি। তুই কিচ্ছু চিন্তা করিস না। পা টা ছুঁয়ে বসে থাক শুধু। আর কাকিমাকে বলিস একটু লোহা, নিমপাতা, আগুন আর মিষ্টির আয়োজন করে রাখতে। শ্মশানযাত্রীরা ফিরলে লাগবে।

শ্মশানযাত্রীরা সদলবলে একটা মানুষকে আগুনের দিকে ঠেলে দেবে বলে মহাসমারোহে কাঁধে তুলে নেয়, হরিবোল দিতে দিতে, খৈ আর খুচরো পয়সা ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে চলে, গাড়িঘোড়া লোকজন তাদের সসম্ভ্রমে রাস্তা করে দেয়, কেউ কেউ কপালে হাত ছোঁয়ায়, আর কেউ মৃতদেহ দেখবে না বলে অন্য দিকে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় চট করে। ঘাটের পুরোহিত ডোম, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। শ্মশানের এক কোণে একটা ঝুপড়ির সামনে এক বিহারি দম্পতি একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে বসে আছে সকাল থেকে। গঙ্গায় চান করে ভিজে কাপড়ে বসে আছে ওরা। খালি পেটে। পাগলা বাবার আদেশে। ওই একটা মড়া এলো।

র: ওই বুড়োটা কী করে রে?

জ: শুনেছি মৃগী টিগি সারিয়ে দেয়। মন্ত্রপূত লিট্টি খাইয়ে। সবাই পাগলা বাবা বলে ডাকে।

র: সব শালা ভন্ড।

চঃ সব পাখি মাছ খায় আর নাম হয় আমার! বাড়িতে নিজের ঘরে বসে লুকিয়ে বিলিতি মারলে কোনো উচ্চবাচ্য নেই কারুর, আর আমি সপ্তাহে একদিন মদ খেয়ে বাড়ি ফিরলেই বাওয়াল? ধুসসালা ভাল্লাগে না...।

ষঃ ওরা বাড়িতে বসে খায়। রাস্তায় রিক্সাওয়ালার সাথে খুচরো নিয়ে বচসা করে পাড়া মাথায় করে লঙ্কাকান্ড বাধায় না।  

খঃ লক্ষ্মী মেয়ে উঠে এসো। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর টর বাধালে একটা কান্ড হবে। ফাল্গুন মাস!

হঃ (গান) একে তো ফাগুন মাস দারুণ এ সময়, লেগেছে বিষম চোট কী জানি কী হয়…

ছঃ আমি তোমার কাছে, সময় ছাড়া আর কিচ্ছু কোনদিন চাইব না।

ঘঃ হ্যাঁ বরাবরই তোমার দামী জিনিসের দিকেই নজর, জানি।

ভ: একটা ক্রিমের দাম আটশো টাকা! এত দামী ক্রিম হয়!

শ: এটা এন্টি এজিং ক্রিম। এগুলো একটু দামিই হয়। তুমি এসবের কী বোঝো শুনি? আর তোমার টাকায় তো কিনিনি। তোমার এত মাথাব্যথা কীসের?

ড: নিজের টাকায় তো কিনেছ? কষ্ট করে উপার্জন করা টাকায়। এভাবে নষ্ট করার কোনো মানে হয়?

শ: আর তুমি যে তোমার কষ্ট করে উপার্জন করা দিনের পর দিন ইনভেস্ট করার নামে নষ্ট করছ তার বেলা? কোনদিন তো লাভ করেছ বলে শুনলাম না।

ড: ওটা আর এটা এক?

শ: হ্যাঁ। ওটাও বাজার। এটাও। তুমিও খদ্দের, আমিও।