Thursday, December 18, 2014
রক্ত
ঈশ্বর, আর একটা কর্ম ব্যস্ত দিনের শেষে যখন তুমি সুগন্ধি সিগার ধরিয়ে আরামকেদারায় মৌজ করছিলে তখন, ঠিক তখনই ওরা তোমার সই করা ফরমান হাতে নিয়ে বুলেট গাঁথছিল নরম একরত্তি সব শরীরে। তামাকের মৌতাতে তোমার একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল নিশ্চই কারণ তুমি একদল নিরীহ শিশুর চিৎকার শুনতে পাওনি। জরুরী টেলিগ্রাম করে ফেরার আদেশ দাওনি তোমার সৈনিকদের। সুদৃশ্য ক্রিস্টালের গ্লাসে শিশুরক্ত পান করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেপেছিলে চামড়ার ক্রমবর্ধমান জৌলুশ। বেহালার করুণ আবহসঙ্গীত তোমাকে বুঝতে দেয়নি শরীরের অনুপস্হিতি। ঝাড়লন্ঠনের বাহারি হলুদ আলোয় আয়নার মায়াবী ছায়া দেখে ওদের মতই তুমিও বিশ্বাস করো, তুমি আছো। চিয়ার্সের ভঙ্গিতে গ্লাস তুলে মাথাটা একটু সামনে ঝুঁকিয়ে বলে ওঠো - 'আমিই সর্বশক্তিমান'॥
মদন্যক
সমস্ত দিন জেলের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে নিজের সেলে দেওয়ালের কাছ ঘেঁষিয়া বসিয়া ছিলাম। নিকটেই একটি খুনের আসামি পোঁদ উল্টাইয়া ঘুমাইতেছে। চুপ করিয়া খানিকটা বসিয়া ঐ আসামির ক্লান্ত ঘুম দেখিয়া হঠাৎ মনে হইল যেন কোনো পাঁচতারা হোটেলে পার্টির শেষে ভোররাতে নেশার ঘোরে কার্পেটে বসিয়া আছি। আর ঐ আসামি আমার কোনো সহচর মাতাল। পরক্ষণেই বিকেলের ঘন্টার আওয়াজে সে ভ্রম ঘুচিল।
অনেক দিনের কথা হইলেও কালকার কথা মনে হয়।
জেলের ভিতরের পরিশ্রম চোখ রাঙানির মধ্যে অহরহ ডুবিয়া থাকিয়া এখন যখন মহাকরণ, কি পাঁচতারা হোটেল, সেই ফুর্তি, সেই মামণির মেলা, সেই স্কচ, সেই সিঙ্গল মল্ট, সেই হুইস্কি, সেই চাটুকারের দল, সেই টলিউড, সেই নায়িকার কোল, সেই আমোদ প্রমোদের কথা ভাবি, তখন মনে হয় বুঝি কোন অবসর-রাতের শেষে খোঁয়াড়ির ঘোরে এক সৌন্দর্যভরা জগতের স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম, জীবনে এমন দিন কখনো আসে নাই।
শীতের আদর
তেলেভাজার দোকানের কালো কড়ায় টগবগে তেলের মধ্যে আকুলিবিকুলি করতে থাকা আলুর চপের ফ্যাকাসে হলুদ থেকে সোনালী, সোনালী থেকে বাদামী হয়ে ওঠার মুচমুচে দৃশ্য দেখে যে চাঞ্চল্য বুক এবং মুখের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তার থেকেই বুঝতে পারি, শীতকাল এসে গেছে। বালিশের রোদ রোদ গন্ধ, সপ্তাহান্তের মিষ্টি মিষ্টি কাজু কিশমিশ কড়াইশুঁটি গাজর দেওয়া ফ্রায়েড রাইসও মনে করিয়ে দেয়, এ পৌষমাস - এ সময় সর্বনাশের নয়। জেলুসিলের শিশি এখন কদিন ভুলে থাকলেও চলবে। সাদা মূলো, ধনেপাতা, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মাখা জূঁঈফূলের মত এক বাটি মুড়ি আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের কাছে ফিরব বলে ছটা বাজার পাঁচ মিনিট আগেই অফ করি অফিসের কম্পিউটার। খাদি থেকে কেনা কাঁচের শিশির মধু কড়মড়ে টোষ্টের গায়ে আদর করে লেপ্টে যাবে বলে মুখিয়ে থাকে। সকালের সব্জি বাজার চকচকে টমেটো, বেগুন, পেঁয়াজকলি, সাজিয়ে মুখ টিপে হাসে। রবিবার ভোরে রেলের ওপার থেকে মাটির কলসির মুখে উদগ্রীব ফেনার যৌবন সাজিয়ে হেঁকে যায় খেজুরের রসওয়ালা। সাধারণ পায়েস রসগোল্লায় কোন ম্যাজিকে কে জানে, আচমকা মিশে যায় খেজুর গুড়ের হাত নিশপিশ করা গন্ধ।
আঁচলে পৌষ-মাঘ বেঁধে জিভ দিয়ে শুষে নি শীতের রঙিন আদর।
নিশি
ঘুম টা ভেঙ্গে গেল। আচমকা। জমাট নিরেট রাত। সুইচবোর্ডের লাল আলোটা চেয়ে আছে। সিঁড়ির ঘড়িটা টিক টিক টিক টিক করে চলেছে, চলেছেই। ভয় করছে। চোখ বন্ধ করলেই গলার কাছটায় ডেলা পাকাচ্ছে ভয়। অনেকদিন আগে এরমই এক ভয়ের রাতে বাথরুমে গিয়ে বাঁ হাতের শিরায় ফাঁকা সিরিঞ্জের ছুঁচ বিঁধিয়ে দিয়েছিল সে। বুড়ো আঙুলটা ডান্ডার মাথার চাকতিটায় চেপে ধরে আস্তে আস্তে ঠেলতে শুরু করেছিল। নীল শিরাটা হাওয়ার চাপে একটু ফুলে উঠতেই অবশ্য আঙ্গুল সরিয়ে নিয়েছিল। বার করে নিয়েছিল ছুঁচ। শিরাটা কিছুদিন ফুলে ছিল। তারপর আবার আগের মতন। কেউ খেয়াল করেনি। বাথরুমে যাবে না সে। ক্যাবিনেটের আয়নায় নিজের ফোলা মুখটা রাতে দেখলে আরো ভয় হয়।
বিছানায় উঠে বসে একটা সিগারেট ধরালো। অন্ধকার ঘরে নিঃশ্বাস নিতে থাকা আগুনের মন্ডটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভয়টা একটু কমলো। আলো ফুটলে, চান করে, খেতে বসে তিন আঙুলে গরম ভাত ডাল দিয়ে মাখতে মাখতে ভয়টা কমে আসে। ট্রেনের ঠাসাঠাসি ভিড়ে, হকারের চিৎকারে, যাত্রিদের ঘামের গন্ধে আশ্বস্ত লাগে। অটোওয়ালা খুচরো চেয়ে দাঁত মুখ খিঁচোলে আরাম হয় বেশ।
অফিসের এক্সেল শীটগুলো ঠান্ডা ঘরে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে আবার বিন্দু বিন্দু ভয় বুকে দানা বাঁধে। সন্ধ্যেয় বেরিয়ে পানশালায় হাজিরা দিতে হয়। দু'হাতে বিয়ারের ঠান্ডা গ্লাসটা ধরে বেশ ভালো লাগে। উষ্ণ লাগে। সোনালি তরলে বুদবুদের মরে যাওয়া দেখে শান্তি হয়।
সিগারেটটা শেষ। আবার হাতটা খালি হয়ে যায়। বালিশের নিচে থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে। দু'হাতে চেপে ধরে চিত হয়ে জোড়া হাত বুকের ওপরে রেখে শুয়ে পড়ে। চোখ বুজে। হাতদুটো ঘেমে উঠছে। ঘুম আসবে। ঘুম আসছে।
নামগুলো একা পড়ে থাকে লকআউট কারখানার মত
ষ্টিলের থালার গায়ে খোদাই করা থাকে "কটকটিকে সোনামা"| সঞ্চয়িতার প্রথম পাতায় লাল কালিতে জ্বলজ্বল করে "গাবলুর উপনয়নে বদুয়া"| কিছু নাম রয়ে যায় মোবাইলের কন্ট্যাক্ট লিস্টে| আর কতকগুলো স্রেফ হারিয়ে যায় মানুষগুলোর সঙ্গে| মনে থেকে যায়, কানে শোনা যায় না| নামের কপিরাইট হাতবদল হয় না| নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা মুখগুলো হয়তো দেখা দেয় এলবামে, বিয়ের, অন্নপ্রাশনের ভিডিওতে| কিন্তু নামের ডাকগুলো কি শোনা যায় আর?
একতলা থেকে গলা ফাটিয়ে খেতে বসতে আসার ডাক, বিজয়া দশমীতে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ঢুকতে ঢুকতে উঠোন কাঁপানো ডাক...হারিয়ে যায় সব| বুকের ভেতরে শুধু পাথর জমতে থাকে| ধ্বনি দিলেও প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় না|
একতলা থেকে গলা ফাটিয়ে খেতে বসতে আসার ডাক, বিজয়া দশমীতে রসগোল্লার হাঁড়ি হাতে ঢুকতে ঢুকতে উঠোন কাঁপানো ডাক...হারিয়ে যায় সব| বুকের ভেতরে শুধু পাথর জমতে থাকে| ধ্বনি দিলেও প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় না|
কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে
অপার্থিব কথাটার মানে বুঝেছিলাম গত কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে| সন্ধ্যে তখন সাতটা হবে| ভুটানের পুনাখায় নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি| ওপারে পুনাখা জঙ হলুদ আলো মেখে ঘুমে| পাহাড়ের মাথাগুলো অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে| মাঝে মাঝে দূর থেকে টুরিস্ট, ড্রাইভারদের কথা হাসির টুকরো শব্দ ছিটকে আসছে কানে| ক্যামেরা আর ফোনের চার্জ শেষ| সময়ও| গাড়ি অপেক্ষা করছে| ওয়াঙদিফদ্রং যেতে হবে| হঠাত কী মনে করে কে জানে, একটা বিশাল বিকট চাঁদ পাহাড়ের আড়াল থেকে বিনা ভূমিকায় বেরিয়ে এল| অন্ধকারে নদীর রুপোলি আলো চোখের তারা ছুঁলো| মনে পড়ে গেল আজ কোজাগরী পূর্ণিমা| বুকের ভেতর ফুলে ফুলে উঠতে লাগলো জোয়ারের জল - ভরা কোটালের ঢেউ মাংসগন্ধ পাওয়া বেপরোয়া যুবতীর মতো চাঁদের দিকে ছুঁড়তে লাগলো ফেনিল ইশারা| মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খেতেই থাকলো কার্তিকের জ্যোত্স্নার প্রান্তরে| হৃতপিন্ডের তালে তালেই প্রায় একটা একটা পাড়ের নুড়ি গলে মিশে যায় তরল রুপোয়| তলপেট, কোমর, বুক ছাপিয়ে ওঠে রুপোলি জল| গাড়ির ড্রাইভার অধৈর্য্য আঙুল চাপে হর্নে|
এত সুন্দর আমি জীবনে দেখিনি!
Tuesday, November 25, 2014
রেড ক্রস
১
ডঃ সুকুমার শীল মনে মনে ঠিকই করে রেখেছেন আজ সবাইকে এক হাত নেবেন। সেই সমস্ত সহকর্মী যারা তাঁকে আড়ালে এবং আজকাল প্রকাশ্যেও ডঃ সু-শীল বলে ডাকেন আর কথায় কথায় তাঁর ছেলের ব্যপারে খোঁটা দেয়, আজকের ম্যানেজমেন্ট মিটিঙে তিনি তাদের দেখে নেবেন। ডঃ শীলের ঠাকুর্দার সময় থেকে পরিবারের প্রায় সকলেই ডাক্তারিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। শহরে তাঁদের পরিবারের নামডাক প্রচুর। তাঁর দুই ভাই, এক বোন, জামাইবাবু, ডাক্তার। ভাইপো ভাইঝিরাও ডাক্তারি পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বাগড়া দিয়ে বসলো তাঁর সুপুত্র। সে হারামজাদা জয়েন্ট এন্ট্রান্সটা পাশ করতেই পারলো না। অগত্যা কি আর করা। ডঃ সু-শীল গিয়ে মন্ত্রীমশাইয়ের পায়ে ধরে পড়লেন। মন্ত্রীমশাই তাঁর বহু বছরের পেশেন্ট। বাড়িতেও আসেন অনুষ্ঠান, পুজো পার্বণে। মন্ত্রীমশাইয়ের কল্যাণে ছেলেটা একটা মেডিকেল কলেজে ঢুকে বংশের মুখ রক্ষে করতে পেরেছে কোনোমতে। সেই ঘটনা কিকরে কে জানে হাসপাতালের ডাক্তারগুলো জানতে পেরেছে আর তার পর থেকেই তাঁর নাম দিয়েছে ডঃ সু-শীল।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মিটিঙের সময় হয়ে এলো। হাসপাতালের আয় নাকি কমে গেছে। মুহুর্মুহু গজিয়ে ওঠা হালফ্যাশনের ঝাঁ চকচকে নতুন নতুন হাসপাতাল নাকি বিজ্ঞাপন, প্যাকেজের জোরে রুগি টেনে নিচ্ছে। এই লেক ভিউ হাসপাতাল বেসরকারি হলেও বহুদিনের পুরনো। নামডাকও ভালোই। তাই হৃত গৌরব ফেরানোর চেষ্টায় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে ম্যানেজমেন্ট। সিনিয়র ডাক্তারদেরও বলা হচ্ছে বেশি করে রুগি হাসপাতালে নিয়ে আসতে আর যতটা পারা যায় বেশি বিলিং করাতে। এক প্রকার টার্গেট দেওয়াই হয়েছে বলা যায়। আরও বলা হয়েছে নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ভাবতে যাতে করে হাসপাতালের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।
২
মিটিঙের শুরুতেই জেনারেল ম্যানেজার চৌধুরি সবাইকে এক হাত নিলেন। ডঃ সাঁতরা কে ওষুধ কোম্পানির টাকায় সিরিয়ালের নায়িকার সাথে ব্যাংকক যাওয়া নিয়ে খোঁটা দিতেও ছাড়লেন না। তারপর সকলের কাছে নতুন স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে আইডিয়া চাইলেন। ডঃ শীল যেহেতু সিনিওরিটিতে সবার আগে তাঁর কাছেই সবার আগে জানতে চাওয়া হল। তিনি মোটামুটী রেডি ছিলেন, প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন।
মিঃ চৌধুরি, আমার মনে হয় বাঁধা গতের বাইরে ভাবার দরকার এখন। রোগের হার যেহেতু হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, নিত্যনতুন রুগি সেই অর্থে খুঁজে পাওয়াও কঠিন। ওদিকটা যেমন চলছে চলতে থাকুক। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। দিনকাল যা পড়েছে, মাঝে মধ্যেই নেতা মন্ত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং সেই অবস্থায় একটা asylum খুঁজছেন। একটা safe house আর কি। আসুন, আমরা বরং সেক্রেটারিয়ট লেভেলে এটা মার্কেট করতে থাকি আর সি এম-এর সাথে একটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট নিয়ে ওনাকেও ব্যপারটা জানিয়ে রাখি। তাহলে দেখবেন অচিরেই আমরা unofficially সরকারী safe haven এ পরিণত হয়েছি। ব্যবসা বা প্রচার কিছু নিয়েই আর ম্যানেজমেন্টকে মাথা ঘামাতে হবে না। আর প্রেসকে কোনো খবরাখবর পাচার করা হলেই স্টাফের চাকরি যাবে, internally এই মেসেজটা ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যস।
৩
এই মিটিঙের পর থেকে লেক ভিউ হাসপাতালের রমরমা। ডঃ শীল প্রকৃত অর্থেই সুশীল হয়েছেন। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে হয়তো একটা টিকিট পেলেও পেতে পারেন। তারঁ ছেলে এখানকার পড়াশুনো শেষ করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। ফিরে এসে নিজের হাসপাতাল খুলবে বায়না করেছে। ডঃ সুশীল তাই জমির বায়নায় নেমেছেন। দাতব্য চিকিৎসালয় খুলবে বলে সরকারের কাছে কুড়ি তিরিশ একরের মতো একটা ছোটখাটো প্লট চেয়েছেন। অসুস্থ নেতারা সবরকমভাবেই তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।
ডঃ সুকুমার শীল মনে মনে ঠিকই করে রেখেছেন আজ সবাইকে এক হাত নেবেন। সেই সমস্ত সহকর্মী যারা তাঁকে আড়ালে এবং আজকাল প্রকাশ্যেও ডঃ সু-শীল বলে ডাকেন আর কথায় কথায় তাঁর ছেলের ব্যপারে খোঁটা দেয়, আজকের ম্যানেজমেন্ট মিটিঙে তিনি তাদের দেখে নেবেন। ডঃ শীলের ঠাকুর্দার সময় থেকে পরিবারের প্রায় সকলেই ডাক্তারিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। শহরে তাঁদের পরিবারের নামডাক প্রচুর। তাঁর দুই ভাই, এক বোন, জামাইবাবু, ডাক্তার। ভাইপো ভাইঝিরাও ডাক্তারি পড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে বাগড়া দিয়ে বসলো তাঁর সুপুত্র। সে হারামজাদা জয়েন্ট এন্ট্রান্সটা পাশ করতেই পারলো না। অগত্যা কি আর করা। ডঃ সু-শীল গিয়ে মন্ত্রীমশাইয়ের পায়ে ধরে পড়লেন। মন্ত্রীমশাই তাঁর বহু বছরের পেশেন্ট। বাড়িতেও আসেন অনুষ্ঠান, পুজো পার্বণে। মন্ত্রীমশাইয়ের কল্যাণে ছেলেটা একটা মেডিকেল কলেজে ঢুকে বংশের মুখ রক্ষে করতে পেরেছে কোনোমতে। সেই ঘটনা কিকরে কে জানে হাসপাতালের ডাক্তারগুলো জানতে পেরেছে আর তার পর থেকেই তাঁর নাম দিয়েছে ডঃ সু-শীল।
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মিটিঙের সময় হয়ে এলো। হাসপাতালের আয় নাকি কমে গেছে। মুহুর্মুহু গজিয়ে ওঠা হালফ্যাশনের ঝাঁ চকচকে নতুন নতুন হাসপাতাল নাকি বিজ্ঞাপন, প্যাকেজের জোরে রুগি টেনে নিচ্ছে। এই লেক ভিউ হাসপাতাল বেসরকারি হলেও বহুদিনের পুরনো। নামডাকও ভালোই। তাই হৃত গৌরব ফেরানোর চেষ্টায় কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে ম্যানেজমেন্ট। সিনিয়র ডাক্তারদেরও বলা হচ্ছে বেশি করে রুগি হাসপাতালে নিয়ে আসতে আর যতটা পারা যায় বেশি বিলিং করাতে। এক প্রকার টার্গেট দেওয়াই হয়েছে বলা যায়। আরও বলা হয়েছে নতুন স্ট্র্যাটেজি নিয়ে ভাবতে যাতে করে হাসপাতালের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।
২
মিটিঙের শুরুতেই জেনারেল ম্যানেজার চৌধুরি সবাইকে এক হাত নিলেন। ডঃ সাঁতরা কে ওষুধ কোম্পানির টাকায় সিরিয়ালের নায়িকার সাথে ব্যাংকক যাওয়া নিয়ে খোঁটা দিতেও ছাড়লেন না। তারপর সকলের কাছে নতুন স্ট্র্যাটেজি সম্পর্কে আইডিয়া চাইলেন। ডঃ শীল যেহেতু সিনিওরিটিতে সবার আগে তাঁর কাছেই সবার আগে জানতে চাওয়া হল। তিনি মোটামুটী রেডি ছিলেন, প্রায় এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন।
মিঃ চৌধুরি, আমার মনে হয় বাঁধা গতের বাইরে ভাবার দরকার এখন। রোগের হার যেহেতু হঠাৎ করে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়, নিত্যনতুন রুগি সেই অর্থে খুঁজে পাওয়াও কঠিন। ওদিকটা যেমন চলছে চলতে থাকুক। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। দিনকাল যা পড়েছে, মাঝে মধ্যেই নেতা মন্ত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং সেই অবস্থায় একটা asylum খুঁজছেন। একটা safe house আর কি। আসুন, আমরা বরং সেক্রেটারিয়ট লেভেলে এটা মার্কেট করতে থাকি আর সি এম-এর সাথে একটা অ্যাপয়ন্টমেন্ট নিয়ে ওনাকেও ব্যপারটা জানিয়ে রাখি। তাহলে দেখবেন অচিরেই আমরা unofficially সরকারী safe haven এ পরিণত হয়েছি। ব্যবসা বা প্রচার কিছু নিয়েই আর ম্যানেজমেন্টকে মাথা ঘামাতে হবে না। আর প্রেসকে কোনো খবরাখবর পাচার করা হলেই স্টাফের চাকরি যাবে, internally এই মেসেজটা ছড়িয়ে দিতে হবে। ব্যস।
৩
এই মিটিঙের পর থেকে লেক ভিউ হাসপাতালের রমরমা। ডঃ শীল প্রকৃত অর্থেই সুশীল হয়েছেন। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে হয়তো একটা টিকিট পেলেও পেতে পারেন। তারঁ ছেলে এখানকার পড়াশুনো শেষ করে বিদেশে পাড়ি দিয়েছে। ফিরে এসে নিজের হাসপাতাল খুলবে বায়না করেছে। ডঃ সুশীল তাই জমির বায়নায় নেমেছেন। দাতব্য চিকিৎসালয় খুলবে বলে সরকারের কাছে কুড়ি তিরিশ একরের মতো একটা ছোটখাটো প্লট চেয়েছেন। অসুস্থ নেতারা সবরকমভাবেই তাঁকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন।
Subscribe to:
Posts (Atom)